সীতারামসীতারাম

সীতারাম বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উপন্যাস। ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত উপন্যাসটি প্রচার পত্রিকায় (শ্রাবণ, ১২৯১ – মাঘ, ১২৯৩; মাঝে কয়েকমাসের বিরতি সহ) প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালের মার্চে, পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ৪১৯। তৃতীয় ও শেষ সংস্করণ বঙ্কিমচন্দ্রের জীবদ্দশায় মুদ্রিত হলেও প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে, ১৮৯৪ সালের মে মাসে।
বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যান্য উপন্যাসের মতো সীতারামও নানাভাবে আলোচিত ও সমালোচিত৷ এই বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মৌলবাদ থেকে পরিত্রাণের উপায়’ প্রবন্ধে বলেন—
শেষ উপন্যাস ‘সীতারাম’-এ এসে তিনি (বঙ্কিমচন্দ্র) উপন্যাসকে নিজেই বলেছেন অলীক কাহিনী। মানুষের কাজ সেখানে চাপা পড়ে সাধু-সন্ন্যাসীর তৎপরতার নিচে। ‘বঙ্গদর্শন’ থামিয়ে দিয়ে ‘প্রচার’ বের করলেন তিনি। এবং ‘প্রচারে’ প্রচার করলেন ধর্মতত্ত্ব। মানুষের মধ্যে নায়ক খোঁজা ছেড়ে দিয়ে নায়ক করে আনলেন শ্রীকৃষ্ণকে। প্রত্যাহার করে নিলেন ‘সাম্য’ নামক তাঁর প্রায়-বৈপ্লবিক গ্রন্থটিকে। সাহিত্যকে করে তুললেন ধর্মে আরোহণের সোপান। এরও আগে, তাঁর ঔপন্যাসিককালেই ওই যে ত্রয়ী উপন্যাস- ‘আনন্দমঠ’, ‘দেবী চৌধুরাণী’ ও ‘সীতারাম’, তাতেই জীবনবিমুখতার লক্ষণ ফুটে উঠেছিল। ‘আনন্দমঠ’ শেষ হয়েছে সশস্ত্র যোদ্ধাদের আত্মসমর্পণে। ‘দেবী চৌধুরাণী’র রানি প্রফুল্ল পাঁচ বছরের অনুশীলন ও পাঁচ বছরের রানিত্ব শেষে ফিরে যায় জমিদারগৃহে, শেষ দৃশ্যে দেখি তাকে ঘাটে বসে সানন্দে বাসন মাজছে; সন্ন্যাস ধর্মের চেয়েও কঠিন জেনে ওইভাবে সংসারধর্ম পালন করছে সেই রানি, তিন সতিনের একজন হয়ে। ‘সীতারাম’-এর জয়ন্তী জীবনের চরিতার্থতা খুঁজে পায় একাকী সন্ন্যাসিনী জীবন যাপন করে। ‘আনন্দমঠ’-এর ব্যাপারটা ঐতিহাসিক। সে উপন্যাসে ইংরেজ শত্রু নয়, মুসলমানই শত্রু— এই বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে। অবশ্যই বলা যাবে যে ওই মুসলমান বঙ্গদেশের কৃষক নয়, পরাণ মণ্ডলের প্রতিবেশী হাসিম শেখ নয়, ওই মুসলমান শাসক-মুসলমান; কিন্তু এভাবে হিন্দুরা পড়েনি এ উপন্যাস, মুসলমানদের তো পড়ারই কথা নয়।”