গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়কে লিখিত

নমস্কার পূর্বক নিবেদন
আপনার যাহা বক্তব্য তাহা কাল বৈকালে মুখে মুখেই বলিতে পারিতেন, তথাপি পত্রখানি যে নিজে হাতে করিয়া আনিয়াছিলেন, ইহা আমার বিশেষ সৌভাগ্য কারণ, মুখের কথা তখনই অন্তর্হিত হইত, কিন্তু পত্রখানি যত্ন করিয়া রাখিলে শত বৎসর থাকিতে পারে। আমি উহা যত্ন করিয়া তুলিয়া রাখিব এবং আমার মৃত্যুর পর ঐরূপ যত্ন করিয়া তুলিয়া রাখিবার জন্য আমার দৌহিত্রদিগকে বলিয়া যাইব। কারণ উহাতে আপনি আমাকে বলিয়াছিলেন যে “আপনার সম্মানে বঙ্গবাসী মাত্রেরই সম্মান করা হইয়াছে ও সম্মানও সম্মানিত হইয়াছে”। অন্যে এ কথা বলিলে, তাহার মূল্য যাহাই হউক, আপনি সত্যবাদী ও সমাজের শিরোভূষণ স্বরূপ অতএব আপনার এই উক্তি আমার বংশে চিরস্মরণীয় ও চিররক্ষণীয়।
যদি বিষবৃক্ষ অনুবাদিত হইয়া প্রথম পরিচিত হয় তখন একখানি ইংরেজি সংবাদপত্র (Scotsman) বলিয়াছেন যে, ঐ গ্রন্থ সংস্কৃত Epic কাব্যের Episode গুলির সহিত তুলনীয়, এবং একজন বলিয়াছেন যে Sophocles প্রণীত Antigone চরিত্রের পর আর ইহার তুল্য স্ত্রী চরিত্র কোন সাহিত্যে সৃষ্ট হয় নাই। এই সকল কথা আমি বড় গৌরবের কথা মনে করিয়াছিলাম। কিন্তু আপনার উক্তি আমার পক্ষে তদপেক্ষা অধিকতর গৌরবের হইয়াছে। ইতি ১৯ পৌষ ১৩০০ [২ জানুয়ারি ১৮৯৪]
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শ্রীচরণেষু—
আপনি মঙ্গলবার যে পত্র লিখিয়াছিলেন তাহা আমি বৃহস্পতিবারে পাইয়াছি। আর বুধবারে যে পত্র লেখেন তাহা শুক্রবার পাইয়াছি। এরূপ বিলম্বের কারণ আপনার চিঠি সময়ে post হয় না। তিনটার মধ্যে চিঠি post করিতে হয়।
দাদার পীড়া মারাত্মক নহে তজ্জন্য ব্যস্ত হইবেন না। গোড়ায় Homeopathic treatment করিলে tap করিবার প্রয়োজন হইত না। এক্ষণে হইয়াছে ঔষধ আমি তাঁহাকে বলিয়া দিব যদি আর কখনও হয় তবে প্রথমাবস্থায় ব্যবহার করিলে সহজে আরাম হইবে। আমার ভরসা আছে রক্ষা পাইবেন।
যতদিন না নিঃশেষ আরাম হন ততদিন কলিকাতায় রাখিবেন। বোধ করি তাঁহার চিকিৎসার ব্যয় তাঁহাকে কিছুই বহন করিতে দেন নাই। ব্যয় আমার ব্যয়ে হওয়া কর্তব্য। টাকার প্রয়োজন হইলে উমাচরণকে বলিবেন সে সরবরাহ করিবে। দাদার নিঃশেষ আরোগ্য সম্বাদের প্রতীক্ষায় রহিলাম। ১০ই মাঘ।
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শ্রীচরণেষু—
আপনার একখানা পত্র পাইলাম, তাহার তারিখ নাই, প্রায় থাকে না।
বরদা ভট্টাচার্য ৫‍৲ খাজানা পায় তজ্জন্য সে ৫X২০=১০০‍৲ পাইতে পারে। High Court ruling এই যে Every person should receive amount of compensation proportionate to his interest in the land, উহার interest ৫‍৲ annually— এ জন্য ১০০‍৲ পাইতে পারে। আমি ঐ ১০০‍৲ লইয়া সাধাসাধি করিয়াছি তাহাতে সে আমাকে কটূক্তি করিয়া গিয়াছে।
তার উপর উহাকে বলিয়াছি যে যদি তুমি না লও তবে তোমাকে চিরকাল ঐ খাজনা দিব। এবং তাহার খাজানা আদায়ের জন্য আমার অন্য সম্পত্তি আবদ্ধ রাখিয়া লেখাপড়া করিয়া registry করিয়া দিতে চাহিয়াছিলাম। তাহাতে সে রাজী না হইয়া কড়া কথা বলিয়া গিয়াছে।
তাহাকে কেহ বুঝাইয়াছে যে আমি ১২০০‍৲ টাকা পাইয়াছি তাহার মধ্যে ৮০০‍‍৲ তাহার প্রাপ্য, বড়বাবু আমাকে আটশত টাকা দিবার জন্য পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করিয়াছেন এবং নিজে চণ্ডী ভট্টচার্য প্রভৃতিকে ফাঁকি দিবার জন্য আমার সাহায্য চাহিতেছেন। যখন জমি মাপ হয় তখন আমি ঝিনাইদহ ছিলাম, আমার লোকজন জরিপের সময়ে কেহ উপস্থিত ছিল না। তথাপি এই ভট্টাচার্য বলিয়া বেড়াইতেছে যে আমি জুয়াচুরি করিয়া খরিদা ব্রহ্মোত্তর বলিয়া তাহা খাইয়াছি এবং আপনাকেও ঐরূপ লিখিতে সাহস করিয়াছে। যখন কাঁটালপাড়ার সকল লোকের আমার প্রতি এই ব্যবহার, তখন কাজেই কাঁটালপাড়ার বাড়ী ফেলিয়া দিলাম।
ইতি ১১ জুন
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Midnapore, 1887
17th Aug., ২রা ভাদ্র
শ্রীচরণেষু—
কাঁটালপাড়ায় স্কুল বা কলেজ বা University যাহাই হ’ক তাহাতে আমি কোন সাহায্য করিব না। কাঁটালপাড়ার পূজায় আমি টাকা দিব না। এ বৎসর আমি ও আমার পরিবার পূজার সময়ে মেদিনীপুরেই থাকিব। সুতরাং কলিকাতাতেও পূজা করিতে পারিলাম না।
যেখানে বরদা ভট্টাচার্যের মত ব্যক্তি আমাকে জুয়াচোর বলে, যে স্থানে রামকৃষ্ণ ও ব্রজনাথের মত লোক আমার পিতাকে জালসাজ বলে, যে দেশে বসন্ত ও চণ্ডী ভট্টাচার্যের মত লোকের সঙ্গে দলাদলি এবং যেখানে বড়বাবুর মত সহোদরের মুখদর্শন করিতে হয়, সে দেশের সঙ্গে আমি কোন সম্বন্ধ রাখিব না। সেখানে আমার দুর্গোৎসব হইবে না।
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
আপনি বাড়ী আসিয়াছেন জানিয়া আনন্দিত হইলাম। আসিবেন তাহা জানিতাম, কেন না আমি দেখিয়াছি আপনার মনে রাগ ভিন্ন বৈরাগ্য উপস্থিত হয় নাই, রাগ পড়িয়া যায়, বৈরাগ্য ভিন্ন সংসার ত্যাগ হইতে পারে না। এজন্য আমি যতীশের মাতাকে বলিয়াছিলাম যে চারিমাস অপেক্ষা কর, কেননা টিকিটের ম্যায়াদ ৪ মাস। চারিমাসে না আসেন তখন ব্যস্ত হইও। যাহা হউক আসিয়া ভালই…
অনেক দুঃখ পাইয়াছেন; ইহাই প্রমাণ যে বৈরাগ্যের অনেক দেরী, মমতা পরিত্যাগই বৈরাগ্য, যাহা হউক আসিয়াছেন ভালই হইয়াছে, এখন আমার বোধ হইতেছে যে আমাকে আপনার ঠিকানা বলিয়া দিতে নিষেধ না করিলে ভাল হইত। কেননা আমি ঠিকানা বলিতে অস্বীকৃত হইয়া অনেকের কাছে শত্রু হইয়াছি, অন্ততঃ বড়বাবু ঐরূপ প্রতিপন্ন করিতেছেন।
চিরণ প্রভৃতির…অবস্থা তাহাও আমারই দোষ বলিতে হইবে, কেননা আমি মাসে ত্রিশ টাকা মাত্র দিয়াছি কিন্তু আমারও দোষ বড় নাই কেননা আমি আপনাকে টাকা পাঠাইয়াছি। আপনি বিদেশ যাত্রার পর তাহাকে কিছু দিই নাই বটে…সে খুচরা ১০/২০ টাকা নিতে নারাজ এককালীন বেশী দিতে হইবে। আমি টাকার সাশ্রয় করিবার জন্য বাড়ীর ত্রিশ টাকা বরাদ্দ করি নাই। কিন্তু অনেকের সেই বিশ্বাস এবং সেইজন্য আমি নিন্দিত হইয়াছি। বড়বাবুর কাছে অনেক গালি খাইয়াছি। কপালী যে তাহার ভাইকে ২৫‍৲ টাকা দেয় সেই দৃষ্টান্ত দ্বারা আমার চরিত্রের শোধন করিবার চেষ্টা পাইয়াছেন। বড়বাবু…
তিনি আমাকে সম্প্রতি লিখিয়াছেন তাঁহার সহিত শত্রুতা করাই ভায়েদের কার্য, তিনি মরিলে আমরা কি করিব জিজ্ঞাসা করিয়াছেন। আমি কোন উত্তর দেই নাই।

27.12.87
শ্রীচরণেষু—
জ্যোতিশের নিজ পরিবার প্রতিপালন…কিন্তু আপনার ভার তাহার উপর আমার দিবার ইচ্ছা নাই। তাহা পূর্বপত্রে লিখিয়াছিলাম। এবং এক্ষণে সবিস্তার বিবেচনা করিয়া লিখিতেছি—
স্বর্গীয় কর্তা মহাশয় জীবিত থাকিতে তাঁহার (১) আহার (২) পরিধেয় (৩) চিকিৎসা এই তিন প্রকারের ব্যয় আমরা নির্বাহ করিতাম। আপনার সম্বন্ধেও আমি তাহাই করিতে চাহি। অতএব ইহার বন্দোবস্ত আমি নিম্নলিখিতভাবে করিলাম।—
(১) নিজ প্রয়োজনীয় ঘৃত ময়দা কিনিয়া দিয়া আসিবে। /১॥• সের দুগ্ধ বরাদ্দ থাকিতে পারে তাহার মূল্য মাস মাস আমি দিব…
(২) বস্ত্র…তা এবং শয্যা গাত্রবস্ত্র প্রভৃতি যখন যাহা নিজের জন্য প্রয়োজনীয় হইবে উমাচরণকে বা আমাকে জানাইলে পাঠাইয়া দিব।
(৩) আপনার নিজ চিকিৎসার বিল ডাক্তারকে আমার কাছে পাঠাইতে বলিয়া দিলাম।
কর্তার প্রতি যাহা করিতাম আপনার প্রতি তাহা করিতে চাহিতেছি ইহাতে আপনার অনভিমত হইবে না বিবেচনা করি।
…দ্বারা লেপের খোল পাঠাইয়া দিয়াছি পৌঁছ সংবাদ দিবেন। ১৩ পৌষ।