উপন্যাস

Posted on
সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি ভাষায় Rajmohan’s Wife নামে উপন্যাস রচনা করেন, এটি কোন ভারতীয় লেখকের লেখা প্রথম ইংরেজি উপন্যাস৷ এরপর তিনি আর ইংরেজি গ্রন্থ রচনা করেন নি৷ ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু। ভেবেছিলেন মাইকেল মধুসূদনের মতো কবিতা লিখে খ্যাতি অর্জন করবেন৷ কিন্তু দুটি কবিতা গ্রন্থ প্রকাশ করার পর বুঝতে পারেন কবিতায় হবে না গদ্য লিখতে হবে৷ এরপর ১৮৬২-৬৪ সালে রচনা করে ‘দূর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাস৷ ১৮৬৫ সালের মার্চে এই উপন্যাস প্রকাশিত হয়৷
প্রকৃতপক্ষে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ দিয়েই তার সাহিত্য জীবনের সূচনা। এই উপন্যাস দিয়েই বঙ্কিমচন্দ্র নতুন এক দিগন্ত খুলে দিলেন। বাঙালির রোমান্টিক সত্তার এক নতুন জাগরণ ঘটল তার উপন্যাসে। বঙ্কিমচন্দ্রের এমন তিনটি উপন্যাস হলো, দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা এবং মৃণালিনী। এরপর বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভার স্ফূরণ দেখা গেল ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার প্রকাশনা ও সম্পাদনার মাধ্যমে। এই মাসিকপত্রে তিনি পরপর বিষবৃক্ষ, ইন্দিরা, যুগলাঙ্গুরীয়, চন্দ্রশেখর ইত্যাদি উপন্যাসের পাশাপাশি নানান বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। বঙ্গদর্শনের আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যে যুগান্তর এনেছিল। সম্পাদক বঙ্কিমচন্দ্রের বিশিষ্ট অবদান হলো প্রবন্ধ ও সমালোচনা সাহিত্যের বিকাশ ও বিস্তার। দুই বছর বন্ধ থাকার পর সঞ্জীবচন্দ্রের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শন’ পুনরায় প্রকাশিত হয়। রাধারাণী, রজনী, কৃষ্ণকান্তের উইল এই যুগের রচনা।
বাংলা উপন্যাসের সূত্রপাত ও এপিকধর্মী বাংলা উপন্যাসের জনক হলেও তিনি সমালোচকদের কাছে আজও সমালোচিত। তাকে সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট করা হয়। এ জন্য অনেকে সংস্কৃত শব্দ ও যবন, ন্যাড়া, ইত্যাদি শব্দের অতি ব্যবহারকেও এককভাবে দায়ী বলে মনে করেন। অথচ এই বঙ্কিমচন্দ্রই ‘সাম্য’ রচনা করেছিলেন।

[the_ad id=”536″]

ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাসগুলোতেও তাকে অনেক সমালোচক খাটো করার চেষ্টা করেন। তার ‘সীতারাম’ নিয়ে বহু কথা প্রচলিত আছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, উপন্যাস আর ইতিহাসের বই এক নয়। বঙ্কিমের সীমাবদ্ধতা তার উপন্যাসের চরিত্রে। তার চরিত্র বড়ও হয়নি, ছোটও হয়নি—বামুন রয়ে গেছে। এত বড় ঔপন্যাসিকের জন্য এটা কোন সংকট নয়। এর প্রমাণ বঙ্কিম চর্চা কমেনি বরং সময়ের সঙ্গে বাড়ছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যযুগের রচনায় দেখা যায় সৌন্দর্য ও লোকশিক্ষার মিলন। শেষ যুগে লোকশিক্ষার প্রাধান্য। প্রতিভার শেষ ধাপে প্রকাশিত পত্রিকা ‘নবজীবন’ ও ‘প্রচার’। এই যুগের প্রধান উপন্যাস ‘রাজসিংহ’, ‘আনন্দমঠ’ ‘দেবী চৌধুরাণী’, ‘সীতারাম’। ‘দেবী চৌধুরাণী’ আংশিকভাবে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হয়। ‘সীতারাম’ প্রচারে প্রকাশিত হয়। তার অনেক উপন্যাসই তিনি বারবার নতুনভাবে লিখেছেন বা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেছেন। এর দৃষ্টান্ত হলো ‘ইন্দিরা’, ‘রাজসিংহ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’।
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রায় সব উপন্যাসই ইংরেজি, জার্মান, হিন্দী, কানাড়া, তেলেগু প্রভৃতি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। তার উপন্যাসগুলোর নাট্যরূপ সাফল্যের সঙ্গে মঞ্চে অভিনীত ও সিনেমায় রূপায়িত হয়েছে। উপন্যাসগুলোর নাটকীয়তা ও রোমান্টিকতা সাফল্যের একটা কারণ। ঐতিহাসিক উপন্যাসের বিস্তৃত আঙিনায় বাঙালির রোমান্টিক মনকে প্রথমে মুক্তি দিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। ভাষা ও উপন্যাসের কাঠামো তৈরির বিষয়ে তিনি পথ দেখিয়েছিলেন। দেশের রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষামূলক উন্নতির সব রকম প্রয়াসে তিনি অবিরাম লিখেছেন। আনন্দমঠের বন্দেমাতরম মন্ত্র ভারতবর্ষে অপূর্ব দেশপ্রীতির উদ্ভব ঘটিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র কেবলমাত্র সাহিত্যিক বা লেখক নন, উপরন্তু তিনি যুগস্রষ্টা। ঐতিহাসিক, রোমান্টিক, পারিবারিক—এই তিন ধারায় উৎসারিত বঙ্কিমচন্দ্রের আখ্যানগুলোর সমসাময়িক ও পরবর্তী সাহিত্য ও জীবনের ওপর অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করেছে। রাসভারী, গম্ভীর লোক হলেও বন্ধুবৎসলতার গুণে সুধীবৃন্দের সমাবেশে উন্নত রুচি, পরিচ্ছন্ন, সুদর্শন বঙ্কিমচন্দ্র প্রতিভার দীপ্তচ্ছটায় বাংলা সাহিত্যের আকাশ সমুজ্জ্বল রেখেছিলেন।
নিম্মে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমূহের তালিকা প্রদান করা হলো—
বাংলা উপন্যাস
ঐতিহাসিক উপন্যাস, ১৮৬২-৬৪ সালে রচিত ও মার্চ, ১৮৬৫ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত৷
কাব্যিক উপন্যাস, ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকের প্রকাশিত৷
ঐতিহাসিক উপন্যাস, ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকের প্রকাশিত৷
সামাজিক উপন্যাস, ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত৷
অনু-উপন্যাস, ১৮৭৩ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ৷
ঐতিহাসিক অনু-উপন্যাস, ১৮৭৪ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত৷
রোমাঞ্চধর্মী ঐতিহাসিক উপন্যাস, ১৮৭৫ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত৷
অনু-উপন্যাস, ১৮৮৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত৷
রোমাঞ্চধর্মী উপন্যাস, ১৮৭৭ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত৷
সামজিক উপন্যাস, ১৮৬৫ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ৷
ঐতিহাসিক উপন্যাস, ১৮৮২ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত৷
ঐতিহাসিক উপন্যাস, ১৮৮২ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত৷
ঐতিহাসিক উপন্যাস, মার্চ, ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত।
ঐতিহাসিক উপন্যাস, মার্চ, ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত।
English Novel
ভারতীয় লেখকের লেখা প্রথম ইংরেজি উপন্যাস, ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দ৷
অসমাপ্ত উপন্যাস
ভারতীয় লেখকের লেখা প্রথম ইংরেজি উপন্যাস, ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দ৷