দেবী চৌধুরাণী

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অন্যতম জনপ্রিয় উপন্যাস দেবী চৌধুরাণী। এটি বঙ্কিমের ‘ত্ৰয়ী’ — যথা আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরানী ও সীতারাম উপন্যাসের দ্বিতীয়টি৷ এই উপন্যাস ত্রয়ীর নায়িকারা হচ্ছে শান্তি, প্ৰফুল্ল ও শ্ৰী৷ দেবী চৌধুরাণী বিভিন্ন সময়ে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮৪ সালে৷ বঙ্কিমচন্দ্রের জীবিতকালে এর ছয়টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ সংস্করণ ১৮৯১ সালে মুদ্রিত।
কাহিনী
গ্রামের নিরক্ষরা মেয়ে প্রফুল্ল, বিধবার অনিন্দ্যসুন্দরী কন্যা। তার রূপের জন্যই ভূতপুরের জমিদার হরবল্লভ তাঁর পুত্ৰ ব্ৰজেশ্বরের সঙ্গে প্রফুল্লের বিবাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার অদৃষ্টে সুখ ছিল না। বড়ঘরে বিবাহ হচ্ছে বলে তার মা যথাযথ মৰ্যাদা রাখবার জন্য নিজের যাবতীয় সম্পত্তি বিক্রয় করে বিবাহের রাত্রে বরযাত্রীদের যথোচিত সমাদরের সঙ্গে উপযুক্ত আহারের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু কন্যাপক্ষীয়দের জন্য ব্যবস্থিত আহারের নিকৃষ্টতা দেখে, কন্যাপক্ষীরা তাঁর বাড়িতে সমাগত হয়েও আহার গ্ৰহণ করল না। প্ৰফুল্পর মাকে শাস্তি দেবার জন্য তারা পাকস্পর্শের দিন হরবল্লভের বাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়ে সেখানে রটনা করল ষে, প্ৰফুল্পর মা কুলটা।
কিছুকাল পরে প্রফুল্লর মা প্রফুল্পকে নিয়ে হরবল্লভের বাড়ি যায়। হরবল্লভের গৃহিণী প্ৰথমে তাদের দেখে বিমুখ হলেও, পরে প্রসন্না হয়ে পুত্রবধূকে গ্ৰহণ করবার জন্য হরবল্লভের কাছে অনুনয়-বিনয় করে। হরবল্লভের পুত্র ব্রজেশ্বরও এ-সম্বন্ধে প্রয়াস করে। কিন্তু তাদের সব চেষ্টাই বিফল হয়। হরবল্লভ তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। সে কি-ভাবে খাবে, প্রশ্ন করলে, হরবল্লভ প্ৰফুল্লকে বলে—’চুরিডাকাতি করে খাবে’। প্ৰফুল্ল মায়ের সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসে। মা অসুস্থ হয়ে পড়ে, এবং কিছুদিন পরে মারা যায়। তার অসহায় অবস্থা দেখে, স্থানীয় জমিদারের নায়েব পরাণ চক্রবর্তী তাকে অপহরণ করে। কিন্তু পথিমধ্যে অন্য লোক দেখে, তাদের ডাকাত ভেবে, ডাকাতের ভয়ে পরাণ ও তার পালকিবাহকরা পালিয়ে যায়। সেই অবসরে প্ৰফুল্ল পালকি থেকে বেরিয়ে নিকটস্থ জঙ্গলে প্ৰবেশ করে এবং এক পায়ে-হাটা শীর্ণ পথের রেখা ধরে এক ভগ্ন অট্টালিকায় এসে পৌঁছায়। সেখানে এক বৃদ্ধকে মৃত্যুশয্যায় শায়িত দেখে। মৃত্যুর পূর্বে বৃদ্ধের সেবাশুশ্ৰষা করে। প্রীত হয়ে বৃদ্ধ তার সঞ্চিত ধনের গুপ্তকক্ষের সন্ধান প্ৰফুল্পকে দেয়। বৃদ্ধের মৃত্যুর পর প্রফুল্ল তার শেষকৃত্যাদি সম্পন্ন করে ও মাটির তলার সেই গুপ্তকক্ষ থেকে কুড়ি ঘড়া মোহর ও ধনরত্নাদি পায়।
ধনরত্নাদি পেয়ে প্রফুল্প ভাবল—‘এখন কি করি? কোথায় যাই? এ নিবিড় জঙ্গল ত থাকিবার স্থান নয়, এখানে একা থাকিব কি প্রকারে? যাই বা কোথায়? বাড়ী ফিরিয়া যাইব? আবার ডাকাইত ধরিয়া লইয়া যাইবে। আর যেখানে যাই, এ ধনগুলি লইয়া যাইব কি প্রকারে? লোক দিয়া বহিয়া লইয়া গেলে জানাজানি হইবে, চোরডাকাত কাড়িয়া লইবে। লোকই বা পাইব কোথায়? যাহাকে পাইব, তাহাকেই বা বিশ্বাস কি? আমাকে মারিয়া ফেলিয়া টাকাগুলো কাড়িয়া লইতে কতক্ষণ? এ ধনরাশির লোভ, কে সম্বরণ করিবে?’ এরূপ নানারূপ চিন্তা করে, শেষ পর্যন্ত প্রফুল্ল জঙ্গলে থাকাই সিদ্ধান্ত করল এবং গৃহকর্মে প্ৰবৃত্ত হল। কিন্তু হাড়ি, কাঠ, চাল-ডাল সকলেরই অভাব। প্ৰফুল্ল একটা মোহর নিয়ে হাটের সন্ধানে বেরুল। পথিমধ্যে এক ব্ৰাহ্মণের সঙ্গে দেখা হল। প্ৰফুল্ল ব্ৰাহ্মণকে হাটের পথ জিজ্ঞাসা করল। ব্ৰাহ্মণ বলল—‘হাট এক বেলার পথ, তুমি একা যেতে পারবে না৷’ ব্ৰাহ্মণ বলল— ‘এই জঙ্গলে আমার একটা দোকান আছে। তুমি সেখান থেকে চাল-ডাল, হঁড়ি ইত্যাদি কিনতে পার। দোকান থেকে চাল-ডাল, হাড়ি ইত্যাদি কিনে প্ৰফুল্ল তাকে একটা মোহর দিল। ব্ৰাহ্মণ বলল— ‘মোহর ভাঙ্গিয়ে দিই, এত টাকা আমার কাছে নাই। তুমি পরে দাম দিও, চল তোমার ঘর চিনে আসি। ‘প্রফুল্ল বলল— ‘আমার ঘরেও পয়সা নেই, সবই মোহর৷’ ‘ব্ৰাহ্মণ বলল— ‘সবই মোহর? তা হোক চল তোমার ঘর চিনে আসি৷’ প্ৰফুল্লর সন্দেহ হল। ব্ৰাহ্মণ বুঝল। বলল–’মা, আমি তোমার সঙ্গে প্রতারণা করবো না, আমার নাম ভবানী পাঠক, আমি ডাকাইতের সর্দার। ‘ভবানী পাঠকের নাম প্ৰফুল্প নিজগ্রাম দুর্গাপুরেও শুনেছিল। ভবানী পাঠক বিখ্যাত দষ্যু। প্ৰফুল্লর বাক্যস্ফুর্তি হল না। ইতিমধ্যে ব্ৰাহ্মণ ঘরের ভিতর হতে একটা দামামা বের করে তাতে গোটাকতক ঘা দিল। মূহুর্তমধ্যে পঞ্চাশ-যাটজন কালান্তক যমের মতো জওয়ান লাঠি-সড়কি নিয়ে উপস্থিত হল। ভবানী তাদের বলল— ‘তোমরা এই বালিকাকে চিনে রাখ। আমি একে মা বলেছি। একে তোমরা সকলে মা বলবে, মার মত দেখবে,  এর কোন অনিষ্ট করবে না, আর কাকেও করতে দেবে না। এখন তোমরা বিদায় হও।
এরপর চলল প্ৰফুল্পর জীবনের ক্রান্তিপর্ব। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার ভিতর দিয়ে প্ৰফুল্পর পরবর্তী পাঁচ বৎসর অতিবাহিত হল। প্ৰফুল্লর সঙ্গে থাকবার জন্য দুজন স্ত্রী লোক দেওয়া হল। একজন গোবরার মা, সে মাত্র হাটবাজার করে। আর একজন নিশি, সে প্ৰফুল্পর সখীরূপে রইল। প্রফুল্ল নিরক্ষর ছিল। নিশি তাকে বর্ণশিক্ষা, হস্তলিপি, কিঞ্চিৎ শুভঙ্করী আঁক শিক্ষা দিল। পরে ভবানী ঠাকুর তাকে ভট্টি, রঘু, কুমার, নৈষধ, শকুন্তলা প্ৰভৃতি পড়ালেন। তারপর সাংখ্য, বেদান্ত, ন্যায়, যোগশাস্ত্র ও শ্ৰীমদ্ভগবদগীতা। অশনে-বসনেও প্রফুল্পকে নিয়মামুবর্তিতার ভিতর দিয়ে চলতে হল। প্ৰথম বৎসর তার আহার মোটা চাউল, সৈন্ধব, ঘি ও কাঁচকলা। দ্বিতীয় বৎসরেও তাই। তৃতীয় বৎসরে নুন, লঙ্কা ও ভাত। চতুর্থ বৎসরে প্রফুল্লর প্রতি উপাদেয় ভোজ্য খাইতে আদেশ হইল, কিন্তু প্ৰফুল্ল প্ৰথম বৎসরের মতো খাইল। পরিধানে প্ৰথম বৎসর চারিখানা কাপড়, দ্বিতীয় বৎসরে দুইখানা, তৃতীয় বৎসরে গ্ৰীষ্মকালে মোটা গড়া, অঙ্গে শুকাইতে হয়, শীতকালে একখানি ঢাকাই মলমল অঙ্গে শুকাইয়া লইতে হয়। চতুর্থ বৎসরে পাট কাপড়, ঢাকাই কলকাদার শান্তিপুৱী। প্ৰফুল্ল সে-সকল ছিড়িয়া খাটাে করিয়া পরিত। পঞ্চম বৎসর বেশ ইচ্ছামতো। প্ৰফুল্ল মোটা গড়াই বহাল রাখিল৷ মধ্যে মধ্যে ক্ষারে কাচিয়া লইত! কেশবিন্যাস ও শয়ন সম্বন্ধেও এইরূপ কঠোর বিধানের ভিতর দিয়া প্ৰফুল্ল তার ধর্ম, কর্ম, সুখ, দুঃখ সবই শ্ৰীকৃষ্ণকে সমর্পণ করল। ভবানী ঠাকুর বললেন ‘এদেশে রাজা নাই। মুসলমান লোপ পাইয়াছে। ইংরেজ সম্প্রতি ঢুকিতেছে—তাহার রাজ্যশাসন করিতে জানে না, করেও না। আমি দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন করি। এ জঙ্গলে ডাকাইতি করে ধর্মাচারে প্ৰবৃত্ত থাকি৷’
প্ৰফুল্ল ভবানী ঠাকুরের অনুগত শিষ্য হয়ে ধর্মাচরণে প্ৰবৃত্ত হল। নূতন নাম হল দেবী চৌধুরাণী। নিপীড়িত, অত্যাচারিত, দুঃখী লোকদের কাছে রানীমা নামে পরিচিত হল। দু’হাতে তাদের ধন বিলাতে লাগল।
ইজারাদার দেবীসিংহের অত্যাচারে দেশ প্ৰপীড়িত। একবার হরবল্লভের তালুক হতে টাকা চালান আসছিল। ডাকাতের তা লুঠে নিল। সেবার দেবীসিংহের খাজনা দেওয়া হল না। হরবল্লভের দশ হাজার টাকা মূল্যের একখানা তালুক দেবীসিংহ আড়াইশত টাকায় নিজে কিনে নিল। তাতে বাকী খাজনার কিছুই পরিশোধ হল না, দেনার জের চলল। দেবীসিংহের পীড়াপীড়িতে কয়েদের আশঙ্কায় হরবল্লভ আর একটা সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে ঋণ পরিশোধ করল। আবার দেবীসিংহের পঞ্চাশ হাজার টাকা বাকী পড়ল। হরবল্লভ রায়কে গ্রেপ্তার করবার পরওয়ানা বের হল। পুত্ৰ ব্ৰজেশ্বরের মধ্যম স্ত্রী সাগরের পিতা ধনীলোক! বাপকে গ্রেপ্তারের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য ব্ৰজেশ্বর শ্বশুরের কাছে গেল। টাকার ব্যাপার নিয়ে কথা কাটাকাটি হল। শ্বশুর রুক্ষভাবে বললেন— ‘তোমার বাপ বাঁচলে আমার মেয়ের কি? আমার মেয়ের টাকা থাকলে দুঃখ ঘুচবে—শ্বশুর থাকলে দুঃখ ঘুচিবে না৷ ব্ৰজেশ্বর রাগ করে চলে যাচ্ছে দেখে শাশুড়ী জামাইকে ডাকলেন। তিনি জামাইকে অনেক বুঝালেন, কিন্তু জামাইয়ের রাগ পড়ল না। তারপর সাগরের পালা, সাগর ব্ৰজেশ্বরের পায়ে পড়তে গেল। ব্ৰজেশ্বর তখন রাগে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। পা টানতে গিয়ে সাগরের গায়ে লাগল। সাগর বলল— তুমি আমায় লাথি মারবে নাকি? কুপিত ব্ৰজেশ্বর বলল— যদি মারিয়াই থাকি? তুমি না হয় বড়মানুষের মেয়ে, কিন্তু পা আমার-তোমার বড়মানুষ বাপও এ পা একদিন পূজা করিয়াছিলেন। সাগর রাগে জ্ঞান হারাল। বলল—ঝকমারি করেছিলেন। আমি তার প্রায়শিচত্ত করব। ব্ৰজেশ্বর বলল—পালটে লাথি মারবে নাকি? সাগর বলল—আমি তত অধম নই। কিন্তু আমি যদি বামুনের মেয়ে হই, তবে তুমি আমার পা—। এমন সময় পিছনের জানালা হতে কে বলল—আমার পা কোলে নিয়ে চাকরের মতো টিপে দিবে৷ ব্ৰজেশ্বর চলে গেল। পিছনের জানালা হতে যে কথা বলেছিল, সে এখন ঘরে প্রবেশ করল। সাগর জিজ্ঞাসা করল—তুমি কে? স্ত্রীলোক, উত্তর দিল—’আমি দেবী চৌধুরাণী’। নাম শুনে সাগর প্রথম ভয় পেল। কিন্তু পরমুহুর্তে প্ৰফুল্পকে চিনতে পারল। প্ৰফুল্ল সাগরকে নিজ বজরায় নিয়ে গেল।
দেবী চৌধুরাণী নিজ বজরায় ফিরে এসে অমুচর রঙ্গরাজকে আদেশ দিল ব্ৰজেশ্বরকে বজরায় ধরে নিয়ে আসতে। আদেশমতে ব্ৰজেশ্বরকে বজরায় ধরে নিয়ে আসা হল। পর্দার আড়াল থেকে দেবীর সঙ্গে তার কথা হল। ব্ৰজেশ্বর মুক্তিপণ জানতে চাইল। উত্তর—এক কড়া কানাকড়ি৷  ব্ৰজেশ্বর কানাকড়ি দিতে পারল না। তখন কামরার ভিতরে আর-এক স্ত্রীলোক বলল—রানীজি, যদি এক কড়া কানাকড়িই এই মানুষটার দর হয়, তবে আমি এক কড়া কানাকড়ি দিচ্ছি। আমার কাছে ওকে বিক্রয় করুন৷ ব্ৰজেশ্বর ভিতরে প্রবেশ করে দেখল, যে স্ত্রীলোক তাকে কিনল সে মসনদের ওপর শুয়ে আছে। –তার মুখের ওপর একখানা বড় মিহি জরির বুটাদার ঢাকাই রুমাল ফেলা। তার আদেশমতে ব্ৰজেশ্বর তার পা টিপতে লাগল। তারপর রুমালখানা সরাবার পর ব্ৰজেশ্বর দেখল সে-স্ত্রীলোক আর কেউই নয়, সাগর। সাগরের প্রতিজ্ঞারক্ষা হল। ব্ৰজেশ্বর বিস্মিত হল। সাগর বলল—দেবী চৌধুরাণী তার সম্পর্কিত বোন। তারপর ব্রজেশ্বরকে দেবী চৌধুরাণীর কাছে নিয়ে যাওয়া হল। ব্ৰজেশ্বর আবার বিস্মিত হল। প্ৰফুল্লর সঙ্গে তার সাদৃশ্য লক্ষ্য করল। দেবী ব্ৰজেশ্বরকে এক কলসী মোহর দিল, যার মূল্য পঞ্চাশ হাজার টাকার ওপর; দেবী বলল—টাকা আমার নয়, টাকা দেবতার, দেবত্র সম্পত্তি থেকে এ টাকা আপনাকে কার্জ দিচ্ছি। দেবী বলল—আগামী বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমীর রাত্রে এই ঘাটে টাকা আনবেন৷ দেবী উপহারস্বরূপ ব্ৰজেশ্বরকে একটা আংটি দিল। ফেরবার পথে ব্ৰজেশ্বর আংটি পরীক্ষা করে দেখল এ আংটি, তারই আংটি, প্ৰফুল্পকে সে-ই এই আংটি দিয়েছিল। আংটিটা তার অভিজ্ঞান বা ‘আইডেন্টিটি’র সূত্র হয়ে দাঁড়াল। ব্রজেশ্বরের মারফত টাকা পেয়ে হরবল্লভ খুশী হল। কিন্তু টাকা শোধ করবার উদ্যোগ করল না। ভাবল—বৈশাখী শুক্ল সপ্তমীতে যদি দেবীকে ধরিয়ে দিতে পারি, তা হলে টাকাও শোধ করতে হবে না, বরং ইংরেজদের কাছ থেকে কিছু পুরস্কার পাওয়া যাবে। সেরূপই উদ্যোগ করল। পিতা ঋণ পরিশোধের কোনরূপ উদ্যোগ করছেন না দেখে, নির্দিষ্ট দিনে ব্ৰজেশ্বর আরও কিছু সময় প্রার্থনার জন্য দেবীর বজরায় এসে হাজির হল। এদিকে হরবল্লভের কথামতো ইংরেজরা বৈশাখী শুক্লা সপ্তমীতে দেবীকে ধরবার জন্য পাঁচশত সিপাহী সমেত লেফটেনেণ্ট ব্রেনানকে পাঠিয়ে দিল। দেবী প্ৰথমে নিজেকে ধরা দেওয়াই সিদ্ধান্ত করেছিলেন। নিজের দলের সমস্ত লোককে তিনি বিদায় দিলেন৷ একটা মেয়ে মানুষের প্রাণের জন্য এত লোক তোমরা মরিবার বাসনা করিয়াছ—তোমাদের কি কিছু ধৰ্মজ্ঞান নাই? অামার পরমায়ু শেষ হইয়া থাকে, আমি একা মরিব—আমার জন্য এত লোক মরিবে কেন? অামায় কি তোমরা এমন অপদার্থ ভাবিয়াছ যে আমি এত লোকের প্রাণ নষ্ট করিয়া আপনার প্রাণ বাঁচাইব। কিন্তু ঘটনাচক্রে ও ভগবানের ইচ্ছায় কালবৈশাখীর ঝড় উঠে দেবীর সব সিদ্ধান্ত ওলট-পালট করে দিল। ইংরেজ সৈন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। দেবীর মরা হল না। দেবী ব্ৰজেশ্বরের সঙ্গে আবার নিজ শ্বশুরবাড়িতে ‘নতুন বৌ’ হিসাবে ফিরে এল।
উপসংহারে বঙ্কিম বলেছেন–‘রঙ্গরাজ, দিবা ও নিশি দেবীগড়ে শ্ৰীকৃষ্ণচন্দ্রের প্রসাদ ভোজনে জীবন নিৰ্বাহ করিয়া পরলোক গমন করিলেন। ভবানী ঠাকুরের অদৃষ্টে সেরূপ ঘটিল না। ইংরেজ রাজ্যশাসনের ভার গ্ৰহণ করিল। রাজ্য সুশাসিত হইল। সুতরাং ভবানী ঠাকুরের কাজ ফুরাইল। দুষ্টের দমন রাজাই করিতে লাগিল। ভবানী ঠাকুর ডাকাইতি বন্ধ করিলেন। তখন ভবানী ঠাকুর মনে করিলেন আমার প্রায়শ্চিত্তের প্রয়োজন। এই ভাবিয়া ভবানী ঠাকুর ইংরেজকে ধরা দিলেন, সকল ডাকাইতি একরার করিলেন, দণ্ডের প্রার্থনা করিলেন। ইংরেজ হুকুম দিল, যাবজীবন দ্বীপান্তর বাস। ভবানী পাঠক প্ৰফুল্লচিত্তে দ্বীপান্তরে গেল। প্ৰফুল্পকে সম্বোধন করে বঙ্কিম বলেছেন : ‘একবার এই সমাজের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বল দেখি, আমি নূতন নহি, আমি পুরাতন। আমি সেই বাক্যমাত্র; কতবার আসিয়াছি, তোমরা আমায় ভুলিয়া গিয়াছ, তাই আবার আসিলাম—‘পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম। ধর্মসংস্থাপনার্থীয় সম্ভবামি যুগে যুগে’
সমালোচনা
বাংলা গদ্যসাহিত্য যতদিন থাকবে, বঙ্কিম স্মরণ হবেন ততদিনই। গম্ভীর অথচ ললিত একটি গদ্যভাষার সূচনাতে তিনি সেটা নিশ্চিত করে গেছেন। অজস্রবার নিজের লেখনীতে ইংরেজদের গুণ গেয়ে গেছেন বঙ্কিম। অথচ সমসাময়িক ইংরেজ লেখক চার্লস ডিকেন্স যখন টেল অফ টু সিটিজ এর মত কঠোর রুঢ় বাস্তবকে নিয়ে আসছেন আমাদের চোখের সামনে, বঙ্কিম তখনো অতিমাত্রায় নাটকীয়।
দেবী চৌধুরাণীর কাহিনী শুরু হয়েছে শ্বশুরের চাপে স্বামী-পরিত্যক্তা কিশোরী প্রফুল্লকে নিয়ে৷ এরপর কীভাবে বছর কয়েক পরে প্রফুল্ল হয়ে উঠলো সর্বজনশ্রদ্ধেয়া তেজস্বিনী ডাকাত ‘দেবী চৌধুরাণী’ সেই উপ্যাখান নিয়েই আবর্তিত হয়েছে বইয়ের প্রথম ভাগ। প্রায় আড়াইশ বছর আগে বৃটিশ, নবাব আর জমিদারদের অত্যাচারে যখন বাংলা কাঁপছিল তখনই আবির্ভাব ঘটেছিল এই কিংবদন্তী নায়িকার। কিছুটা মিথ আর কল্পনার মিশেলে ইতিহাস তাকে জেনেছে দেবী চৌধুরাণী নামে। বঙ্কিমচন্দ্র তাকেই তার লেখনীর গুণে চিন্ময়ী করে তুলেছিলেন।
কঠোর তপস্যায় সাধনা করে যাওয়া প্রফুল্ল তাই দিনশেষে স্বামীর পদাতলে ফিরে হচ্ছে, ব্রজেশ্বর সাহেবকে চড় মারার মত প্রতিবাদী হয়ে উঠলেও ধর্মের দোহাইয়ে বারবার নতজানু হচ্ছে পিতার কাছে। কিন্তু বইয়ের শেষভাগে সেই দেবী চৌধুরাণীই স্বামীকে ফিরে পেয়ে ঝেড়ে ফেলল তার রাণী পরিচয়। ফিরে গেল পতিব্রতা, স্বামী অন্তপ্রাণ প্রফুল্ল পরিচয়েই৷ লেখকের সমসাময়িক পুরুষতান্ত্রিকতা এই সময়ে এসে হজম করাটা কঠিনও ছিল বটে।
আনন্দমঠের সাথে সম্পর্ক
শান্তি ও প্ৰফুল্লর কর্মব্যঞ্জনার অভিকেন্দ্র ছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির অভ্যন্তরে। অনাবৃষ্টির জন্য ফসল হয়নি। দুর্ভিক্ষের করালা ছায়ায় সমগ্ৰ দেশ আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। অনশনে ও মহামারীতে দেশের এক-তৃতীয়াংশ লোক মারা গিয়েছিল। মহম্মদ রেজা খাঁ তখন রাজস্ব-আদায়ের কর্তা। দেশের এই নিদারুণ দুঃসময়ে রেজা খাঁ একেবারে শতকরা দশ টাকা হারে রাজস্ব বাড়িয়ে দিয়েছিল। জমিদাররা রাজস্ব দিতে পারল না। হেষ্টিংস ও গঙ্গাগোবিন্দ সিংহের কৃপায় ইজারাদার দেবীসিংহ জমিদারীসমূহ জলের দামে কিনে নিল। জমিদারদের ঋণ শোধ হল না। দেনার ওপর দেনা হল। দেবীসিংহের অত্যাচার বাড়তে লাগল। দেশকে অত্যাচার ও অরাজকতার হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য সন্ন্যাসীরা রুখে দাঁড়াল। সাধারণ গৃহীরাও সন্ন্যাসীর দলে যোগ দিল। সন্ন্যাসীদের সেই কর্মযজ্ঞ অবলম্বন করেই রচিত হয়েছিল আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরাণী।
বঙ্কিমের তিনখানি উপন্যাসই ঐতিহাসিক মহাকাব্য। কিন্তু উপন্যাসগুলি ঘটনাপ্রবাহের নিছক অনুবৃত্তি নয়। জনশ্রুতির এলোমেলো নৃত্যকে বঙ্কিম তার অসামান্য সংহতি প্ৰতিভার সাহায্যে ছন্দোবদ্ধ করে এক মূৰ্তিমতী কল্পলোকের সৃষ্টি করেছিলেন। সেকল্পলোকের মানুষরা হিন্দুরাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখেছিল। স্বপ্নটা সম্পূর্ণ বঙ্কিমের নিজস্ব। অনুশীলনতত্ত্বের উন্মাদন তখন বঙ্কিমকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। সেই কুহেলিকাময় আচ্ছন্নতার মুকুৱেই বঙ্কিম হিন্দুরাজ্য স্থাপনের স্বপ্নবিলাসে মত্ত হয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বাঙলায় এরূপ হিন্দুরাজ্য প্রতিষ্ঠা প্রয়াসের কথা লেখে না।