অসম্পূর্ণ নাটকসংযোজনী

DRAMATIS PERSONÆ
রামধন—
রামকৃষ্ণ—
কলাবতী—
দিবা—
নিশা—
প্রথম অঙ্ক
SCENE I
প্রতাপনগরের রাজবর্ত্ম
রামধন—রামকৃষ্ণ।
রামধন। কিসের এত গোল। [নেপথ্যে বহুলোকে “জয় জয় কলাবতী”] ও কিসের জয়ধ্বনি। রামকৃষ্ণ। জান না রাণী কলাবতী স্নান করিয়া যাইতেছেন। রামধন। রাণী স্নান করিয়া যাইতেছেন, তার এত জয়ধ্বনি কেন? [নেপথ্যে “জয় জয় রাণীজিকি জয়”] ঐ শুন। রামকৃষ্ণ। তুমি বিদেশী তাই অবাক হইতেছ। রাণী কলাবতীকে এ নগরের লোক ভক্তি করে। বড়ই ভালবাসে। রামধন। কেন রাণীর কিছু বিশেষ গুণ আছে? রামকৃষ্ণ। তা আছে—রাণী অতিশয় দান-শীলা আর বড় প্রজাবৎসলা। যার যে দুঃখ থাকে, রাণীকে জানাইতে পারিলেই—হইল—তার দুঃখ ঘুচিবে। [নেপথ্যে “জয় জয় মা মা কলাবতীর জয়”] ঐ শোন সকলেই রাণীকে মা বলিতেছে, তিনি প্রজামাত্রেরই মা’র মত। তাঁর গুণেই এখানকার প্রজারা এত সুখী। রামধন। বটে! তবে রাজার এত সুখ্যাতি কেন? রামকৃষ্ণ। রাণীর গুণে। রামধন। তাঁহাকে দেখিতে পাওয়া যায়? তিনি কি প্রাচীনা। রামকৃষ্ণ। না তিনি বড় অল্পবয়স্কা তবে সকলের মা বলিয়া সকলকেই দেখা দেন। চল না আমরা মাতৃ-দর্শনে যাই। রাম। চল।
[উভয়ে নিষ্ক্রান্ত]

SCENE II
রাজার অন্তঃপুর
রাজা রাজেন্দ্র একা।
রাজা। কে না জানে আকাশে মেঘ উঠে? মেঘ-উঠে মেঘ ছাড়ে। এ মেঘও উড়িয়া যাইবে —তবে কেন এত চিন্তা করি?মনে করিয়াছিলাম এ নির্মল আকাশে কখনও বুঝি মেঘ উঠিবে না, আমি মূর্খ তাই এত ভাবি। হায়! কোথা হইতে আবার এ প্রবল শত্রু দেখা দিল? (কলাবতীর সজ্জিতা সখীদিগের প্রবেশ) তোরা কেন গো? এত সাজ গোজ যে। দিবা। আমরা নাচব। রাজা। খামকা নাচবে কেন গো? নিশা। রাণী কলাবতীর হুকুম [নৃত্য আরম্ভ]* রাজা। কেন নাচের হুকুম কেন? দিবা। আগে নাচি। [নৃত্য] রাজা। আগে বল্। নিশা। আগে নাচি। রাজা। আ মর! তোর পা যে থামে না—জোর করে নেচে যাবি নাকি—আমি দেখব না—এই চোক বুজিলাম।
[চোখ বুজিয়া]

দিবা। দেখুন মহারাজ! আপনাকে মুখ ভেঙ্গাচ্চে। নিশা। দেখুন মহারাজ, আপনাকে কলা দেখাচ্চে। রাজা। মরগে যা তোরা! আমি চোক চাব না। নিশা। আচ্ছা কান তো খোলা আছে। (করতালি দিয়া গীত) নয়ন মুদিয়া, দেখিনু সজনী, কানুর কুটিল রূপ। গলেতে বাঁধিয়া পিরীতি কলসী সাগরে দিনু যে ডুব রাজা। শুনবো না (কর্ণে হস্তার্পণ) দিবা। তবে ফুলের ঘ্রাণ নিন। (কবরী হইতে পুষ্প লইয়া রাজার নাসিকার নিকট ধারণ) রাজা। নিঃশ্বাস বন্ধ করিলাম। নিশা। চক্ষু কর্ণ নাসিকা বন্ধ। রসনা বাকি আছে—চল ভাই রান্না মহলে খবর দিই। রাজা। মুখ বুজিয়া থাকিব। নিশা। তবে বড় মা ঠাকুরাণীকে ডেকে দিই রাজা। কেন সে ভয়ঙ্কর ব্যাপার কেন? নিশা। ইন্দ্রিয়ের মধ্যে আপনার বাকি আছে পিটের চামড়া। (কলাবতীর প্রবেশ) কলা। আ মলো, তোরা বড় বাড়ালি দূর হ!
[সখীদ্বয় নিষ্ক্রান্ত]
রাজা। দেখ ত কলাবতী তোমার লোকজন আমায় কিছু মানে না আমার উপর বড় অত্যাচার করে! কলা। কি অত্যাচার করেছে মহারাজ? একটু হাসিয়েছে? সেটা আমারই অপরাধ। তোমার মুখে কয়দিন হাসি দেখি নাই বলিয়া আমি ওদের পাঠাইয়া দিয়াছিলাম। রাজা। আমার মাথায় পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে—আমি হাসিব কি? কলা। কি পাহাড় মহারাজ! আমায় ত কিছু বল নাই। যা ইচ্ছা করিয়া বল না—তা সাহস করিয়া জিজ্ঞাসা করি নাই। কি পাহাড় মহারাজ! পড়িলে তোমার একার ঘাড়ে পড়িবে না। রাজা। পাহাড় আর কিছু নয়—খোদ দিল্লীশ্বর ঔরঙ্জেব।এই ক্ষুদ্র রাজ্যের উপর নজর পড়িয়াছে, বাদশাহের যাহাতে নজর পড়ে তাহা তিনি না লইয়া ছাড়েন না। কলা। এ সম্বাদ কোথা পাইলেন? রাজা। আত্মীয়লোকে দূতমুখে বলিয়া পাঠাইয়াছে। বিশেষ, ঢাকায় সুবাদার অনেক সৈন্য জমা করিতেছেন। লোকে বলে প্রতাপনগরের জন্য। কলা। কেন আমরা কি অপরাধ করিয়াছি? রাজা। অপরাধ বিস্তর। প্রতাপনগর ধনধান্য পূর্ণ-লোক এখানে দারিদ্র্যশূন্য—আর আমরা হিন্দু! হিন্দুর ঐশ্বর্য বাদশাহের চক্ষুশূল। কলা। না, তবে বিনা যুদ্ধে মরিব কেন? রাজা। দেখি যদি বিনা যুদ্ধে কার্যোদ্ধার হয়। আমার ইচ্ছা একবার ঢাকায় যাই। আপনি সুবাদারের মন বুঝি, কোন ছলে যদি বশীভূত করিতে পারি করি। কলা। এমন কর্ম করিও না—ঔরঙ্গজেবের নায়েবকে বিশ্বাস কি? আর আসিতে দিবে না। রাজা। সম্ভব—কিন্তু তাহাতে তাহার লাভ হইবে কি? কলা। রাজহীন রাজ্য সহজে হস্তগত করিবে। রাজা। আমি গেলে তুমি রাজ্যের রক্ষক থাকিবে। কলা। ছি! স্ত্রীলোকের বাহুতে বল কি? রাজা। এখানে বাহুবলের কাজ নয়। বুদ্ধিবলেই ভরসা। প্রতাপনগরের বুদ্ধিবল তুমি একা। কলা। মহারাজ আপনাকে যাইতে দিতে আমার মন সরিতেছে না। রাজা। থাকিলেই কোন মঙ্গল! যুদ্ধেই কোন মঙ্গল! কলা। মারহাট্টা যুদ্ধ করিতেছে—আমরা কি মানুষ নই? রাজা। না আমরা মানুষ নই। শিবাজীর কাজ কি আমার দ্বারা সম্ভবে? আমি যাওয়াই স্থির করিতেছি। এখন শয়ন ঘরে চলিলাম।
[নিষ্ক্রান্ত]

কলাবতী। (স্বগত) বিধাতা, যদি আমায় স্ত্রীলোক করিয়াছিলে তবে আমায়—দূর হৌক সে কথায় এখন আর কাজ কি? হায়! আমি রাণী কিন্তু রাজা কই? রাজা অভাবে প্রতাপনগর রক্ষা হইবে না। হায়! রাণী হইলাম ত রাজা পাইলাম না কেন?
দিবার প্রবেশ

(চক্ষু মুছিয়া) কি লো দিবি? দিবা। এই কাগজটুকু কুড়িয়ে পেয়েছি। [এক পত্র দিল।] কলা। (পড়িলেন) “আমি রাজা রাজেন্দ্রের আজিও প্রবল শত্রু—প্রতাপনগর ধ্বংস করিয়া তোমাকে গ্রহণ করিব। নইলে ভালোয় ভালোয় এসো।” এ পত্র কোথায় পাইলি? দিবা। আজ্ঞে আমি কুড়িয়ে পেয়েছি। কলা। তোকে ফাঁসি দিব। আবশ্যক হইলে আমি হুকুম দিই, তা তুই জানিস? দিবা। জানি—তা আমি কুড়িয়ে না পেলুম তা কোথা পেলুম? কলা। কোথায় পেলি? তুই হাতে হাতে নিয়েছিস! দিবা। মাইরি রাণীমা আমি হাতে হাতে নিই নে। কলা। তবে কোথায় পেলি বল, নইলে ফাঁসি দিব। দিবা। আমি পায়রার গলায় পেয়েছি। কলা। সে পায়রা কোথায়? দিবা। পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছি। কলা। কালী কলম নিয়ে আয়—জবাব লেখ্। দিবা। কালী কলম আছে—কি লিখিব। কলা। লেখ “আমি তোমার পরম শত্রু—তোমায় ধ্বংস করিয়া প্রতাপনগর রক্ষা করিব।” লেখা হইল? দিবা। লিখেছি—পায়রার গলায় বেঁধে দিয়ে আসি? কলা। দে গিয়ে। দিবা। হাঁ রাণীমা এ কে মা— কলা। চুপ! কথা মুখে আনিলে মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে দিব।
[দিবা নিষ্ক্রান্ত]

কলা। পায়ে কাঁটা ফুটিলে কাঁটা দিয়া বাহির করিতে হয়, বুঝি আমাকে তাহাই করিতে হইবে।

SCENE III
রাজার অন্তঃপুর
দিবা-নিশা
দিবা। রাজা ঢাকায় চলিল কেন ভাই?

নিশা। তোর জন্য ঢাকাই কাপড় আন্‌তে।

দিবা। আমি ত এমন হুকুম দিই নে, আমার যে ঢাকাই কাপড় আছে।

নিশা। তবে তোর বর আন্‌তে।

দিবা। কেন এদেশে কি বর পাওয়া যায় না?

নিশা। এ দেশে তেমন দাড়ী পাওয়া যায় না—তোমাকে একটা নেড়ে বর এনে দেবে।

দিবা। তা তার জন্য আর রাজার নিজে যাবার দরকার কি? আমায় বললে আমি একটা খুঁজে পেতে নিতুম। না হয় গোবিন্দ বখশীকে একটা পরচুলো দাড়ি পরিয়ে ঘরে নিয়ে আসতুম।

নিশা। আচ্ছা বখশী মশাইকে বলে রাখ্‌ব।

দিবা। দূর হ পাপিষ্ট—তোর কাছে কোন কথাই বলবার যো নাই। তা যাক;—সত্য সত্য রাজা ঢাকায় চলল?ৌ কেন?

নিশা। কি জানি কেন—রাজা রাজড়ার মন তুমি আমি কি বুঝ্‌ব।

দিবা। তা, রাজা কি ফিরিবে না নাকি?

নিশা। সে কি কথা? অমন কথা মুখে আনতে আছে।

দিবা। রাণী কলাবতী অত কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়েছে কেন?

নিশা। স্বামী বিদেশে গেলে একটু কাঁদ্‌তে হয়।

দিবা। দূর! স্বামী ছেড়ে স্বামীর বাবার জন্য আমি কাঁদিনে।

নিশা। তোর সাত পুরুষের ভিতর স্বামী নাই তুই আবার কাঁদিবি কার জন্য? বরং রাজার জন্য একটু কাঁদিস ত কাঁদ।

দিবা। না ভাই তা পারিব না। বরং মনের দুঃখে বসে বসে লুচি মণ্ডা খাই গে চল।

নিশা। তাও মন্দ নয়।

দ্বিতীয়াঙ্ক
SCENE I
রাজা। আমার কি অপরাধ? কি জন্য দিল্লীশ্বর আমার উপর পীড়ন করিতে উদ্যত?

সুবা। আপনি মুসলমানের দ্বেষক। পাদশাহ মুসলমানের ধর্মরক্ষক। সুতরাং বাদশাহ—

রাজা। আমি কিসের মুসলমানের দ্বেষক? আমার রাজ্যে হিন্দু মুসলমানের তুল্য—

সুবা। প্রতাপনগরে একটি মসজীদ নাই —মুসলমানে নমাজ করিতে পায় না।

রাজা। আমি মসজীদ প্রস্তুত করিয়া দিব।

সুবা। প্রতাপনগরে একটি কাজি নাই—মুসলমানের বিচার কি হিন্দুর কাছে হয়?

রাজা। আমি কাজি নিযুক্ত করিব।

সুবা। মহারাজ—আপনি যদি বাদশাহের এরূপ বশ্যতাপন্ন হন, তবে বাদশাহ কেন আপনাকে রাজ্যচ্যুত করিবেন? কিন্তু আসল কথা এখনও বাকি আছে—প্রতাপনগরে মুসলমান জবাই করিতে পায় না—তার কি হইবে?

রাজা। গোরু ভিন্ন অন্য জবাইয়ে আপত্তি করিব না।

সুবা। কিন্তু গোরুই আসল কথা।

রাজা। হিন্দু হইয়া গোহত্যা করিতে দিব কি প্রকারে?

সুবা। তবে হিন্দুয়ানি ত্যাগ করুন।

রাজা। ধর্মত্যাগ করিব? ইহকাল পরকাল খোওয়াইব? এ কথাও কানে শুনিতে হইল।

সুবা। ইহকাল নষ্ট হইবে না। আপনি ইসলামেরধর্ম গ্রহণ করিলে বরং ইহকালে সুখী হইবেন। রাজ্য বজায় থাকিবে এবং আরও বাড়াইয়া দিব। আর পরকালও যাইবে না। ইসলামই সত্যধর্ম—দেখুন কত বড় বড় হিন্দু এখন মুসলমান হইতেছে। তাহারা কি না বুঝিয়া ধর্মত্যাগ করিতেছে? বরং আপনার যদি সন্দেহ থাকে, তবে আমি ভাল ভাল মোল্লা মুফ্‌তি আপনার কাছে পাঠাইয়া দিতেছি। তাদের সঙ্গে বিচার করুন—বিচারে যদি ইসলাম সত্য ধর্ম বলিয়া বোধ হয়, তবে গ্রহণ করিবেন ত?

রাজা। ইচ্ছা হয় মোল্লা মুফ্‌তি পাঠাইবেন।

কিন্তু কিছু ফলোদয় সম্ভাবনা নাই। সম্প্রতি আমি যাহা নিবেদন করিলাম, অনুগ্রহ করিয়া বাদশাহের নিকট জানাইবেন। গোহত্যা ভিন্ন আর সকলেই আমি সম্মত—বার্ষিক কর দিতেও সম্মত। আজ আমি বিদায় হইব—যে হুকুম হয় অনুগ্রহ করিয়া জানাইবেন।

সুবা। কোথা যাইবেন?

রাজা। অনেক দিন আসিয়াছি, স্বদেশে যাইব।

সুবা। সে কি? আপনার শুভাগমনের সম্বাদ আমি দিল্লীতে এত্তেলা করিয়াছি। সেখান হইতে খেলওয়াত আসিবে—তাহা না গ্রহণ করিয়া কি যাওয়া হয়।

রাজা। বড় অনুগৃহীত হইতেছি কিন্তু আমার অবর্তমানে রাজ্য বিশৃঙ্খল হইতেছে।

সুবা। নাচার—আপনাকে অবশ্য অপেক্ষা করিতে হইতেছে। আপনার ফৌজ সকল বিদায় দিন।

রাজা। সে কি আমাকে কয়েদ রাখিতে চাহেন?

সুবা। ও সব কথা কেন? তবে দিনকত আপনাকে এখানে থাকিতে হইবে। দিল্লীর হুকুম না আসিলে ছেড়ে দিতে পারিব না।

রাজা। (স্বগত) হায়! কলাবতী তুমি যা বলিয়াছিলে তাহাই হইল। (সুবাদারকে) যাহা হুকুম হয় তাহাই তামিল করিব।

সুবা। তছলীম।

[সুবাদার নিষ্ক্রান্ত]

রাজা। কয়েদই ত হইলাম। প্রমথ—প্রমথ—

প্রমথের প্রবেশ।

আমার আজ কাল ফিরিয়া যাওয়া হইতেছে না, তুমি প্রতাপনগরে এই সম্বাদ লইয়া যাও।

প্রমথ। যাইব কি প্রকারে? সকল পথে পাহারা—আমাদের কয়েদ করিয়াছে।

রাজা। আমার শিপাহী সব কোথা?

প্রমথ। নবাবের লোকে তাহাদের হাতিয়ার কাড়িয়া লইয়াছে—তাহাদিগকে প্রতাপনগরে ফিরিয়া যাইবার হুকুম হইয়াছে।

রাজা। ভাল, তাহারাই গিয়া সম্বাদ দিবে।

প্রমথ। দিলেই বা কি হইবে।

SCENE II
কলাবতী-নিশা।
কলা। আজ একুশ দিন হইল মহারাজ ঢাকায় গিয়াছেন আজও কই কোন সম্বাদ ত পাইলাম না।

নিশা। হাঁ, রাণীমা, রাজরাণীতেও কি এমনি করে দিন গণে?

কলা। কই আমি দিন গণিলাম?

নিশা। কাঁদ কেন মা, আমি এমন কিছু বলি নাই।

কলা। নিশা, তুই একবার শহরের ভিতর একটা শিয়ানা পাঠাইতে পারিস্—অবশ্য কেহ কোন সম্বাদ শুনিয়াছে কেন না ঢাকায় ঢের লোক যায় আসে। আমি এত লোক পাঠাইলাম কেহ ত ফিরিল না। বোধ হয়, মন্দ সম্বাদই আসিয়াছে—লোকে সাহস করিয়া আমার সাক্ষাতে বলিতে পারিতেছে না।

নিশা। আপনাকে ব্যস্ত দেখিয়া আমি আপনার বুদ্ধিতেই শহরে অনুসন্ধান করিতে লোক পাঠাইয়া দিলাম—কিন্তু—

কলা। কিন্তু কি?

নিশা। লোকে বলে মহারাজকে সুবাদার আটক করেছে—অমন কর কেন মা! এই জন্য ত বলি নাই। একটু শোও আমি বাতাস করি। উড়ো কথায় বিশ্বাস কি?

(কলার শয়ন)

কলা। বিশ্বাস সম্পূর্ণ। আমি আগেই বলিয়াছিলামযে গেলে তাঁকে আটক করিবে। নিশি! এখন আমার দশা কি হইবে! (রোদন)

নিশা। কাঁদিলে কি হবে মা। আমাদের সকলেরই ত এক দশা হবে। আমরাও নিরাশ্রয় হইলাম—এখন মুসলমানের হাতে জাতি মান প্রাণ সব যাবে?

কলা। কি বললি সবার এক দশা? তোদের যে রাজা মাত্র—আমার যে স্বামী। তুই কি জানিস স্বামী কি ধন!

নিশা। তা বটে। রাজ্য যায় তবু প্রাণটা থাকিলে আমরা বজায় থাকিব। ভাল মা, এক কাজ কর না কেন? রাজার কাছে কেন লোক পাঠাও না যে সুবাদারকে রাজ্য ছাড়িয়া দিয়া আসুন—আমরা না হয় তাঁকে গহনাপত্র বিক্রয় করিয়া খাওয়াইব। কাঁদ কেন মা এ কথায়?

কলা। তুই কেন আমায় অপমান করিস্? কি! আমার স্বামীকে আমি রাজ্য ত্যাগ করিয়া প্রাণ বাঁচাইতে বলিব! নিশা—তোদের ভয় হইয়া থাকে তোরা চলিয়া যা—আমার স্বামী রাজা—তিনি রাজার কাজ করিবেন।—কিসের গোল ঐ?

[নেপথ্যে বহু লোক “জয় মা কলাবতীর জয়”]

আজিকার দিনে কে বলে কলাবতীর জয়?

(দিবার প্রবেশ)

দিবা। মহারাণী! নগরের সকল প্রজা আসিয়া রাজবাড়ী ঘেরিল।

কলা। কি হয়েছে!

দিবা। সকলে বলিতেছে ঢাকার সুবাদার রাজাকে কয়েদ করিয়াছে।

কলা। তারপর প্রজারা কি বলে।

[নেপথ্যে “মহারাণী কলাবতীর জয়”]

ওরা কি চায় দিবা?

দিবা। আপনি স্বকর্ণে শুনুন।

কলা। প্রজারা আমার পুত্র, আমার [নিকট] অবারিতদ্বার। প্রধানদিগকে আমার কাছে ডাকিয়া আন।

[দিবার প্রস্থান। কতিপয় নগরবাসীর সহিত পুনপ্রবেশ]

প্রজাবর্গ। জয় কলাবতীর জয়।

কলা। কি চাও বাবা তোমরা?

১ম প্রজা। মা, আমাদের রাজা কোথায়?

২য় প্রজা। মা, আমাদের রাজাকে নাকি দুষ্ট যবন কয়েদ করিয়াছে। মা, আমাদের বাহুতে কি বল নাই যে বাপের উদ্ধার করি?

পরিশিষ্ট ক
বঙ্কিমচন্দ্র লিখিত অসম্পূর্ণ নাটকটীর পরিত্যক্ত অংশগুলি নিম্নে দেওয়া হইল। বঙ্কিমচন্দ্র প্রথমে নাটকটী এইভাবে আরম্ভ করিয়াছিলেনঃ—

DRAMATIS PERSONÆ
মেঘ রায়

অকলঙ্ক গণিকা

প্রথম অঙ্ক
SCENE I
প্রতাপনগরের রাজবর্ত্ম
মেঘ রায়ের প্রবেশ।
মেঘ। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইল—আর যাইব কি?

এখন আর নগরের ভিতর যাইয়া কি হইবে?

আর একটু রাত্রি হোক্। এই বটতলে বসিয়া [অপেক্ষা] করা যাউক।

[বৃক্ষতলে আসন।

কেনই এত পরিশ্রম করিতেছি? যত্ন সফল হইলেই কি সুখী হইব? না তা নয় তবে যত্নে সুখ আছে—পরিশ্রমেই আরাম। পরিশ্রম বড় মন্দ হইতেছে না—

ইহারই মধ্যে তৃষ্ণা পাইয়াছে—যে ক্ষুধা তৃষ্ণায়

কাতর, তার দ্বারা কোন কার্য উদ্ধার হইবে?

অকলঙ্কের প্রবেশ।

তুমি কি জাতের মেয়ে গা?

অক। আমাদের কি জাত আছে মশাই?

মেঘ। তুমি বেশ্যা? তা হোক তোমার দোকানপাট আছে?

অক। একখানি দোকান করি—পথিক লোক রেঁধে বেড়ে খেয়ে যায়। আপনাকেও ত বিদেশীর মত দেখছি—বিশ্রাম করেন ত আমার দোকানেই আসুন না।

মেঘ। আমার রাঁধা বাড়া নাই একটা ডাব

খেতে পেলেই তৃষ্ণা নিবারণ হয়।

অক। তবে আমার দোকানে আসুন—হাতে

পায়ে জল দিয়ে ঠাণ্ডা হবেন তারপর ডাব কেটে দেব।

মেঘ। (জনান্তিকে) এও কপালে ছিল, আপনার

কাজের জন্য কেন না যাইব। (প্রকাশ্যে) তবে চল।

[উভয়ের প্রস্থান।

SCENE II
অকলঙ্কের দোকান
মেঘ—অকলঙ্ক।
মেঘ। হা গা তোমার দোকোনে এত লোকের

ভীড় কেন?

অক। এখন শহরে ঢের লোক আসছে যাচ্ছে আপনি বিদেশী তাই জানেন না।

মেঘ। কেন গা?

অক। লড়াই বাধবে জান না।

মেঘ। কাতে কাতে?

অক। আমার।

বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উইলসংযোজনী

লিখিতং শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পিতা ৺যাদবচন্দ্র জাতি ব্রাহ্মণ সাং কাঁটালপাড়া পরগণা হাবিলীসহর ষ্টেশন ও সবরেজিষ্টারী নৈহাটী ডিষ্ট্রিক্ট রেজিষ্টারী ২৪ পরগণা হাল সাকিন কলিকাতা পটলডাঙ্গা ৫নং প্রতাপ চাটুয্যের লেন কস্য উইল পত্রমিদং কার্যঞ্চাগে, যেহেতু আমার শরীর অসুস্থ হওয়ায় এবং আমার সাবেক উইল পরিবর্তন করা আবশ্যক বোধ হওয়ায় আমি নিম্নলিখিত উইল করিতেছি—
১ দফা কলিকাতা পটলডাঙ্গার ৫ নম্বর প্রতাপ চাটুয্যের গলির ভদ্রাসন বাটীর ও ৪ নম্বর দুর্গাপ্রসাদ ঘোষের নামীয় জমি যাহাতে আমি স্বত্ত্বাধিকারী ও দখলিকার আছি, আমার মৃত্যুর পর হইতে আমার বনিতা শ্রীমতী রাজলক্ষ্মী দেবী তদুভয়ের সম্পূর্ণ স্বত্তাধিকারিণী হইবেন এবং তদুভয়ের তাঁহার দান বিক্রয় ও হস্তান্তর করিবার সম্পূর্ণ অধিকার এবং তিনি উইল করিয়া অন্যকে দিয়া যাইতে পারিবেন কেবল উপদেশ বা পরামর্শ স্বরূপ আমি লিখিতেছি যে তিনি ঐ উভয় সম্পত্তি আমার জ্যেষ্ঠা কন্যা শ্রীমতী শরৎকুমারী দেবীকে উইল করিয়া দিয়া যাইবেন কিন্তু এই উপদেশের দ্বারা তাঁহার অন্যপ্রকার হস্তান্তর করার ক্ষমতা কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ করিতেছি না।

২ দফা আমার অপরাপর স্থাবর সম্পত্তি সম্বন্ধে উইল করার কোন প্রয়োজন দেখি না।

৩ দফা আমার মৃত্যুর পর আমার সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তিতে আমার বনিতা আইনানুসারেই সম্পূর্ণ অধিকারিণী হইবেন এজন্য সে সম্বন্ধেও কোন উইলের প্রয়োজন নাই, আমার পুস্তকের কপিরাইট অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে গণ্য।

৪ দফা আমার কৃত সাবেক উইল সমস্ত বাতিল ও নামঞ্জুর হইল। ইতি—১৮৯০। ২৩ মে—

ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান সভাসংযোজনী

অনুষ্ঠান পত্র

“জ্ঞানাৎ পরতরো নহি”

১। বিশ্বরাজ্যের আশ্চর্য ব্যাপার সকল স্থিরচিত্তে আলোচনা করিলে অন্তঃকরণে অদ্ভুত রসে সঞ্চার হয়, এবং কি নিয়মে এই আশ্চর্য ব্যাপার সম্পন্ন হইতেছে, তাহা জানিবার নিমিত্তে কৌতূহল জন্মে। যদ্দ্বারা এই নিয়মের বিশিষ্ট জ্ঞান হয়, তাহাকেই বিজ্ঞানশাস্ত্র কহে।

২। পূর্বকালে ভারতবর্ষে বিজ্ঞানশাস্ত্রের যথেষ্ট সমাদর ও চর্চা ছিল, তাহার ভূরি ভূরি প্রমাণ অদ্যাপি দেদীপ্যমান রহিয়াছে। বর্তমান কালে বিজ্ঞানশাস্ত্রের যে সকল শাখা সম্যক্ উন্নত হইয়াছে, তৎসমুদায়ের মধ্যে অনেকগুলির প্রথম বীজরোপণ প্রাচীন হিন্দু ঋষিরাই করেন। জ্যোতিষ, বীজগণিত, মিশ্রগণিত, রেখাগণিত, আয়ুর্বেদ, সামুদ্রিক, রসায়ন, উদ্ভিদতত্ত্ব, সঙ্গীত, মনোবিজ্ঞান, আত্মতত্ত্ব প্রভৃতি বহুবিধ শাখা বহুদূর বিস্তীর্ণ হইয়াছিল। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই, এক্ষণে অনেকেরই প্রায় লোপ হইয়াছে নামমাত্র অবশিষ্ট আছে।

৩। এক্ষণে ভারতবর্ষীয়দিগের পক্ষে বিজ্ঞানশাস্ত্রের অনুশীলন নিতান্ত আবশ্যক হইয়াছে; তন্নিমিত্ত ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান-সভা নামে একটি সভা কলিকাতায় স্থাপন করিবার প্রস্তাব হইয়াছে। এই সভা প্রধান সভারূপে গণ্য হইবে, এবং আবশ্যক মতে ভারতবর্ষের ভিন্ন ভিন্ন অংশে ইহার শাখা-সভ্য স্থাপিত হইবে।

৪। ভারতবর্ষীয়দিগকে আহ্বান করিয়া বিজ্ঞান অনুশীলন বিষয়ে প্রোৎসাহিত ও সক্ষম করা এই সভার প্রধান উদ্দেশ্য; আর ভারতবর্ষ সম্পর্কীয় যে সকল বিষয় লুপ্তপ্রায় হইয়াছে, তাহা রক্ষা করা (মনোরম ও জ্ঞানদায়ক প্রাচীন গ্রন্থ সকল মুদ্রিত ও প্রচারিত করা) সভার আনুষঙ্গিক উদ্দেশ্য।

৫। সভা স্থাপন করিবার জন্য একটী গৃহ, কতকগুলি বিজ্ঞানবিষয়ক পুস্তক ও যন্ত্র এবং কতকগুলি উপযুক্ত ও অনুরক্ত ব্যক্তি বিশেষের আবশ্যক। অতএব এই প্রস্তাব হইয়াছে যে, কিছু ভূমি ক্রয় করা ও তাহার উপর একটি আবশ্যকানুরূপ গৃহ নির্মাণ করা, বিজ্ঞানবিষয়ক পুস্তক ও যন্ত্র ক্রয় করা এবং যাঁহারা এক্ষণে বিজ্ঞানানুশীলন করিতেছেন, কিম্বা যাঁহারা এক্ষণে বিদ্যালয় পরিত্যাগ করিয়াছেন, অথচ বিজ্ঞানশাস্ত্র অধ্যয়নে একান্ত অভিলাষী, কিন্তু উপায়াভাবে সে অভিলাষ পূর্ণ করিতে পারিতেছেন না, এরূপ ব্যক্তিদিগকে বিজ্ঞানচর্চা করিতে আহ্বান করা হইবে।

৬। এই সমুদায় কার্য সম্পন্ন করিতে হইলে অর্থই প্রধান আবশ্যক, অতএব ভারতবর্ষের শুভানুধ্যায়ী ও উন্নতীচ্ছু জনগণের নিকট বিনীতভাবে প্রার্থনা করিতেছি যে, তাঁহারা আপন আপন ধনের কিয়দংশ অর্পণ করিয়া উপস্থিত বিষয়ের উন্নতি সাধন করুন।

৭। যাঁহারা চাঁদা গ্রহণ করিবেন, তাঁহাদের নাম পরে প্রকাশিত হইবে, আপাততঃ যাঁহারা স্বাক্ষর করিতে কিম্বা চাঁদা দিতে ইচ্ছা করিবেন তাঁহারা নিম্ন স্বাক্ষরকারীর নিকট প্রেরণ করিলে সাদরে গৃহীত হইবে।—অনুষ্ঠাতা, শ্রীমহেন্দ্রলাল সরকার।

অনুষ্ঠান পত্রের সাতটি ধারা ক্রমে গ্রহণ করিয়া প্রত্যেক ধারা সম্বন্ধে আমাদের যাহা বক্তব্য, তাহা বলিব।

১। “বিশ্বরাজ্যের আশ্চর্য ব্যাপার সকল স্থিরচিত্তে আলোচনা করিলে অন্তঃকরণে অদ্ভুত রসের সঞ্চার হয়।”

নিদাঘ ঋতুতে নিশানাথহীনা নিশাকালে উচ্চ প্রাসাদোপরি উপবিষ্ট হইয়া— একবার গ্রহ নক্ষত্র তারকা বিকীরিত মন্দাকিনী মধ্য প্রবাহিত গগনপ্রাঙ্গণে দৃষ্টি উৎক্ষিপ্ত কর। সেই অমল নীলিমা, সেই অনন্তবিস্তৃতি, সেই অসংখ্য জ্বলন্ত বিন্দুপাতোজ্জ্বলীকৃতা শোভা, সেই অস্ফুট শ্বেত কলেবরা স্বর্গ মন্দাকিনী, এই সকল শোভা শোভিত দিগ্বলয় ব্যাপী সেই মহাগর্ভ ব্রহ্মাণ্ড কটাহ দেখিলে বিস্ময় পরিপূরিত মনে আপনা আপনি জিজ্ঞাসা করিবে, এগুলি কি? কোথা হইতে আসিল? কি নিয়মে আকাশে বিচরণ করিতেছে?

আধুনিক বিখ্যাতনামা দার্শনিকেরা বলেন, তোমার প্রথম প্রশ্নের অর্থ নাই। ঈশ্বরবাদীরা বলেন, তোমার দ্বিতীয় প্রশ্ন আস্তিকতার মূলসূত্র। তোমার শেষ প্রশ্ন যে বিজ্ঞান প্রবৃত্তিলতার প্রথমাঙ্কুর, তদ্বিষয়ে দুইমত নাই।

তুমি ভাবিতে লাগিলে, কি নিয়মে ইহারা আকাশে বিচরণ করিতেছে। ভাবিতে ভাবিতে এক দিনে, দুই দিনে, এক মাসে, দুই মাসে দেখিতে দেখিতে জানিতে পারিলে যে, ঐ আকাশে সকল নক্ষত্রই ভ্রমণশীল, কেবল একটীই স্থির। এই স্থির তারাটি ধ্রুবনক্ষত্র। সেটি সর্বদাই উত্তরে আছে। এত দিনে তুমি একটী সামান্য জ্যোতিষ নিয়ম পরিজ্ঞাত হইলে; সামান্য নিয়মপরিজ্ঞানেই কত মহৎ উপকার দর্শিতে পারে; দিগ্‌ভ্রান্ত পথিকের পক্ষে এই সামান্য সত্যটি অন্ধকার রাত্রিতে কত উপকার সাধন করে। এক্ষণে জটিল নিয়মে সকলের বিশিষ্ট জ্ঞান হইলে কত ফল দর্শিতে পারে।

কত ফল ফলিতেছে, তাহা ত আমরা এক্ষণে অহরহ প্রত্যক্ষ করিতেছি। কোন পূজ্যপাদ ব্যক্তি বিজ্ঞানবেত্তার সহিত রাবণ রাজার তুলনা করিয়া বিজ্ঞানের ক্ষমতার পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। তিনি বলেন, মহর্ষি বাল্মীকি দোর্দণ্ড দশাননের অসীম প্রতাপ বর্ণনজন্য কবিকুশল কল্পনাবলে অমরগণকে তাহার দাসত্বে নিযুক্ত করিয়া লঙ্কাধিপতির প্রাধান্য স্থাপন করিয়াছেন, কিন্তু বিজ্ঞানবেত্তার প্রভুত্ব এই কল্পনা-প্রসূত রাবণের প্রতাপ অপেক্ষা সমধিক শ্লাঘনীয়। সত্য বটে, দশানন কোন দেবকে মালাকার কার্যে, কাহাকেও বা অশ্বসেবক কর্মে, কাহাকেও বা গৃহপরিষ্কারক দাস্যে, নানা কার্যে নানা দেবগণকে নিযুক্ত করিয়াছিলেন, কিন্তু বিজ্ঞানবেত্তা কি করিতেছেন? তিনি বাষ্পরূপী ইন্দ্রদেবকে মহায়সশকটচালনে নিযুক্ত করিয়াছেন। দেবকন্যা ক্ষণপ্রভা তাঁহার প্রভা লুকাইয়া বিদ্বানের সম্বাদবাহিনীভাবে অবিরত সম্বাদ বহন করিতেছেন। অসীমতেজা প্রভাকর অন্তরালে থাকিয়া নিজকরে সহধর্মিণী ছায়ার সাহায্যে বৈজ্ঞানিক লিপিকর কার্যে ব্যপত আছেন। পৃথিবী দেবী, দিক্‌পাল বরুণ, পবনরাজ, সকলকেই তিনি দাসত্বে আবদ্ধ রাখিয়াছেন। তাঁহারা কখন বিদ্বানের ক্ষুন্নিবৃত্তি জন্য ময়দা ভাঙ্গিতেছেন, কখন শীত নিবারণ জন্য বস্ত্র বয়ন করিতেছেন, কখন কাগজ প্রস্তুত করিতেছেন, কখন ঔষধ প্রস্তুত করিতেছেন। কভু বা বিজ্ঞানবিৎকে স্কন্ধে করিয়া স্বর্গলোকে লইয়া যাইতেছেন। কখন পুস্তক মুদ্রিত করিয়া আনিয়া বিদ্বানকে উপঢৌকন দিতেছেন। কখন বা তাঁহার প্রমোদভবনে, রাজবর্ত্মে আলো জ্বালিতেছেন। কি বিদ্যালয়ে কি গৃহকার্যে কি বিচারালয়ে কি ধর্মমন্দিরে একাকী, সজন, অমরগণ, সকল কালেই সকল অবস্থাতেই বিজ্ঞানবিতের ক্রীতদাস। হরিদ্বারসাগর প্রবাহিতা ভাগীরথীকে ভগীরথ তাঁহার জন্যই অবনীতলে আনিয়াছিলেন। সেই ভাগীরথী তাঁহার জল পরিচারিকা, তাঁহার অভ্যর্থনা জন্য অগস্ত্য মুনি বিন্ধ্যাচলকে অবনত করিয়া থাকিতে বলিয়া গিয়াছেন। হিমাচল বিদ্বানের জন্যই স্বকীয় আগারে তুষার ভাণ্ডার রক্ষা করিতেছেন। বনস্পতিগণ তাঁহার জন্য ফলভার বহন করে। খনি তাঁহারি জন্য উদরে করিয়া বহু মূল্য ধাতু ধারণ করে।

এখন “রত্নাকর হয়েছেন দাস, কুবের তাঁর আজ্ঞাকারী”—। দশানন সমরক্ষেত্রে দেবগণের সহায়তা পান নাই। বিদ্বানের সমরক্ষেত্রে স্বয়ং অগ্নিদেব লৌহগোলক বাহনে বিপক্ষদলে মহামার উৎপাদন করিতেছেন। তাহাতেই বলি কল্পিত রাবণাপেক্ষা আধুনিক বিদ্বানের প্রভুত্ব অধিকতর শ্লাঘনীয়। কবিগুরু বাল্মীকি কলিকালে পনুঃপ্রাদুর্ভূত হইয়া স্বয়ং বিদ্বানের নিকটে রামায়ণ পাঠ করিতেছেন। ভাষাবিজ্ঞান বলে বৈজ্ঞানিক মীনরূপী ভগবানের ন্যায় আবার বেদোদ্ধার করিতেছেন। বৈজ্ঞানিক ঈশ্বরের অবতার। রাবণগৌরবলোপী, প্রতাপশালী শিবিকর্ণ সদৃশ পরোপকারী পরমযোগীর ন্যায় দৃঢ় নিবিষ্ট, সর্বদাই হৃষ্ট ও সকল অবস্থাতেই সন্তুষ্ট।

এই বিজ্ঞান বলেই আধুনিক ইউরোপীয়গণ এই পৃথিবীতে একাধিপত্য স্থাপন করিয়াছেন। দেখুন, বিলাতে খাদ্য সামগ্রী অতি দুর্মূল্য, শ্রমোপজীবিগণ “আমার” বলিতে পারে, “আমার পূর্ব্বপুরুষের” বলিতে পারে, এমন বাসস্থান তাহাদের অনেকেরই নাই; বিলাতে কার্পাসতূলা এক ছটাক পরিমিত উৎপন্ন হয় না; হয় আমেরিকা; নয় ভারতবর্ষ হইতে বিলাতীয়েরা তূলা আমদানি করেন। অথচ যন্ত্র বিজ্ঞানের এমনি ক্ষমতা, মাঞ্চেষ্টরের তন্তুবায়েরা লজ্জাহীনা ভারতের লজ্জা নিবারণ করিতেছে। লাঙ্কাশ্বায়ের দুর্ভিক্ষ হইল, আর যে দেশে ঢাকা আছে, শান্তিপুর শিমলে কলমে আছে, বালুচর বাণারস আছে, মুঙ্গের পাটনা আছে, কালিকট কাশ্মীর আছে, মহীসুর অম্বর সহর আছে—সেই দেশে, যেখানে লক্ষ লক্ষ মণ তূলা প্রতি বর্ষে উৎপন্ন হয়, যেখানে তন্তুবায়কে লিপিকর ভাস্কর বা সূত্রধার অপেক্ষা অধিক শ্রদ্ধা করে, সেই দেশে, যে দেশের তন্তুজাত রোম সম্রাটের রাজপরিচ্ছদ ছিল, যে দেশের সহিত বস্ত্রবাণিজ্য ব্যবসায়ে ব্রতী থাকিয়া মধ্যকালে বিনিষনগর সমৃদ্ধিশালী হয়—সেই দেশে লাঙ্কাশায়েরে দুর্ভিক্ষ হইল বলিয়া হা বস্ত্র যো বস্ত্র শব্দে কর্ণ বধির হইয়া যাইতে লাগিল।

হা অদৃষ্ট! বিজ্ঞান অবহেলার এই ফল। বিজ্ঞানের সেবা করিলে বিজ্ঞান তোমার দাস, যে বিজ্ঞানকে ভজে, বিজ্ঞান তাহাকে ভজিবে। কিন্তু যে বিজ্ঞানের অবমাননা করে, বিজ্ঞান তাহার কঠোর শত্রু। মনে করুন, কোথাকার অন্নকষ্টে পরিচ্ছদকষ্ট হইল। ঐন্দ্রজালিক বিজ্ঞান স্বীয় অবমাননা জন্য এইরূপে বৈরসাধন করিল। এখন ভুক্তভোগী লোক শিক্ষাগ্রহণ কর।

অনেকে বলেন, ইউরোপীয়েরা কেবল বাহুবলে এই ভারতবর্ষে আধিপত্য স্থাপন করিয়াছেন। বাহুবলেই বলুন, আর যাহা বলুন, সে কথা কতক দূর সত্য, তাহার অনুমাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু একথাটিও অত্যুক্তি দোষে দূষিত কখনই বলা যাইতে পারে না যে ইউরোপীয়েরা বিজ্ঞানবলে এই ভারতবর্ষ জয় করিয়াছেন, বিজ্ঞান বলেই ইহা রক্ষা করিতেছেন। বিজ্ঞানেই সতত চালনা করিয়াই বিদেশীয় বণিকদিগকে ভারততীরে আনয়ন করেন, বিজ্ঞানই নানা যুদ্ধে সহায়তা করিয়াছিলেন—এখনও বিজ্ঞান মহায়সশকট বাহনে, তড়িৎতার সঞ্চালনে, কামান সন্ধানে, অয়োগোলক বর্ষণে এই বীরপ্রসূ ভারতভূমি হস্তামলকবৎ আয়ত্ত করিয়া শাসন করিতেছে। শুধু তাহাই নহে। বিদেশীয় বিজ্ঞানে আমাদিগকে ক্রমশঃই নির্জীব করিতেছে। যে বিজ্ঞান স্বদেশী হইলে আমাদের দাস হইত, বিদেশী হইয়া আমাদের প্রভু হইয়াছে। আমরা দিন দিন নিরুপায় হইতেছি। অতিথিশালায় আজীবনবাসী অতিথির ন্যায় আমরা প্রভুর আশ্রমে বাস করিতেছি। এই ভারতভূমি একটি বিস্তীর্ণ অতিথিশালা মাত্র।

দ্বিতীয় ধারার কথার প্রমাণার্থ তদুল্লিখিত শাস্ত্র সকলের কি প্রকার সমালোচনা ছিল, দেখা যাউক।

জ্যোতিষ। জ্যোতিষ বিজ্ঞানশাস্ত্র বটে, কিন্তু প্রাচীন বেদাঙ্গ। সুতরাং ইহার প্রাচীনত্বে সন্দেহ করা ধৃষ্টতা ভিন্ন আর কি বলা যাইতে পারে? ব্রহ্মদেশীয় চন্দ্র সূর্য গ্রহণ তালিকা পঞ্জিকার প্রাচীনত্ব বিষয়ে ফরাসী ও বিলাতি পণ্ডিতগণের মধ্যে নানা বাগ্‌বিতণ্ডা হইয়াছে। অনেক বিদেশীয় পণ্ডিত, হিন্দুরা অতি প্রাচীন জাতি স্বীকার করা, স্বজাতির গৌরব হানিকর বিবেচনা করেন।

হিন্দুজাতি অথবা আর্যেরাই যে জ্যোতিষ্কগণের প্রথম পর্যবেক্ষক, নিয়মানুসন্ধায়ক ও তত্ত্বোদ্ভাবক, তাহা ভাষাবিজ্ঞানবিৎগণের অবশ্য স্বীকার্য। যে সপ্তর্ষি উল্লেখ পূর্বে করিয়াছি, তাহাকে ইয়ুরোপীয়গণ উর্ষ মেজর বা বৃহৎ ভল্লুক বলেন। প্রাচীন বেদেও সপ্তর্ষি শব্দের স্থলে ঋক্ষ (ভল্লুক) শব্দ ব্যবহার আছে। কেবল সংস্কৃত ভাষায় দেখা যায় যে ঋচ্ ধাতুর অর্থ দ্যুতি। ঐ তারা কয়টি অতিশয় উজ্জ্বল। উজ্জ্বলতা দেখিয়া দ্যুতিবাচক কোন নাম দিয়া পরে সেই নামের অর্থ ক্রমে ভল্লুক বোধ করা ও আকার সাদৃশ্য উপলব্ধি করা অত্যন্ত সঙ্গত বোধ হয়। ও এইরূপ করা কেবল আর্যগণেরই সম্ভব হইতে পারে।

হিন্দুরা দূরবীক্ষণ, অণুবীক্ষণ, আলোকবীক্ষণ প্রভৃতি কাচ যন্ত্রের সাহায্য ব্যতীত জ্যোতিষ চালনা করিয়া যে সফলতা লাভ করিয়াছিলেন, তাহা ভাবিলে বিস্ময়াপন্ন হইতে হয়। সামান্য নবদ্বীপপঞ্জিকা সেই বিজ্ঞানের ধ্বংসাবশেষ মাত্র।

দিবামান, রাত্রিমান, তিথিমান, নির্ণয়, চন্দ্রসূর্যের উদয়াস্ত নির্ধারণ—গ্রহ নক্ষত্র সঞ্চার ক্রিয়া স্থির করা, অয়ন গ্রহণ ও সংক্রমণ গণনা—সে সকল এখন অতি ভ্রমসঙ্কুল হউক না কেন, লুপ্তবিজ্ঞানের ধ্বংস চিহ্ন তাহার আর সন্দেহ নাই। এখন জীবিতবিজ্ঞান নাই, তাহার স্থানে কতকগুলি অকৃতজ্ঞ পিতৃমাতৃ শূন্য দুর্বল সঙ্কেত আছে মাত্র। বিজ্ঞান বলে আর্যভট্ট পৃথিবীর অক্ষরেখার তির্যকভাব অবধারণ করিয়াছিলেন ও তাহার পরিমাণ সার্ধ তেইশ অংশ নির্ধারণ করেন। আর এখনকার জ্যোতির্বিজ্ঞানাভিমানীরা সামান্য সূর্য গ্রহণ গণনায় এক দণ্ড বা দুই দণ্ড ভ্রম করিয়া বিজ্ঞানের পরিচয় প্রদান করিলেন। যদি বাপুদেব শাস্ত্রী না থাকিতেন, ত কি লজ্জার কথা হইত! ইচ্ছা ছিল, পূর্বোল্লিখিত বিজ্ঞানগুলি ক্রমে ক্রমে গ্রহণ করিয়া একে একে সকলগুলির বিস্তৃত বিবরণ প্রদান করি, প্রবন্ধের দৈর্ঘ্যভয়ে তাহা করিতে পারিলাম না। সংক্ষেপে দুই চারি কথা লেখা যাইতেছে।

বীজগণিত। কি করা কর্তব্য, স্থির করিতে না পরিয়া লোকে সচরাচর যে বলিয়া থাকে, “আমি অস্থিরপঞ্চে পড়িয়াছি।” সেই অস্থিরপঞ্চ বীজগণিতান্তর্গত এক প্রকার অঙ্ক। যে অঙ্ক প্রাচীন বীজগণিতে অতি শীঘ্র সমাধা হইতে পারে। আর যে অঙ্ক যুনানী দেশে দ্যোফান্ত প্রথম উদ্ভাবন করেন, ও সেইজন্য যাহাকে দ্যোফান্তীন বলে, যাহা সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রথম সিদ্ধ হয়, তাহাও হিন্দুবীজগণিত মধ্যে আমরা শুনিয়াছি। যে দেশের দ্যোফান্তের বহু পূর্বে দ্যোফ্যান্তীন কূট সাধ্য হইত, সেই দেশীয় শৌভঙ্করিক বীরগণ সামান্য ভগ্নাংশে “এক পর্বতপ্রমাণ দেউল” দেখিয়া শ্লোকোক্ত বীর তাহা ভাঙ্গিতে সমর্থ হওয়া দূরে থাকুক, উদ্দেশ্য প্রমাণ করিয়া পলায়নপর হয়েন। (*) তথাপি আশা করিবার অনেক স্থল আছে, কেননা আবার সেই দেশেই দেখিতেছি যে দিল্লী কলেজে সুবিখ্যাত অধ্যাপক রামচন্দ্র স্বীয় অপূর্ব গ্রন্থ “গরিমা লঘিমা” প্রচার দ্বারা বিলাতীয় বিখ্যাতনামা ডিমরগণ বৈজ্ঞানিকেরও বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছেন। ও ভূয়ো প্রশংসাবাদ আকর্ষণ করিয়া লইয়াছেন। ভরসা এই, যদি মরুভূমি মধ্যে আমরা এরূপ বটবৃক্ষ দেখিতে পাইলাম, তাহা হইলে কর্ষিত ক্ষেত্রে উৎসাহবারি সেচনে ভারতভূমি কল্পতরু বা কল্পলতাই উৎপাদন করিবে।

মিশ্রগণিত। মিশ্রগণিতে অজ্ঞতানিবন্ধন কত অনর্থ হইতেছে, তাহা কে গণনা করিতে পারে? আমরা উদাহরণের জন্য একটি সামান্য অনর্থের উল্লেখ করিতেছি। মানবদণ্ডের (পাল্লার দাঁড়ির) উভয় সীমা মধ্যরজ্জু হইতে সমান ব্যবধানে স্থিত না থাকিলে মানদণ্ড জলতলের সহিত সমানান্তরাল হইবে না, অর্থাৎ এক দিক অন্য দিক অপেক্ষা কিছু ঝোক্তা হইবে। এইরূপ স্থলে যে দিক উচ্চ হইয়াছে, সেই দিকে পাত্রে কিছু ভার দেওয়া অর্থাৎ পাষাণ ভাঙ্গিয়া ওজন দেওয়ার প্রথা আছে, কখন ফেরে ফেরে অর্থাৎ দুই সের দ্রব্য দিতে হইলে এক সের ঝোক্তা দিকে ওজন করিয়া আর এক সের উচ্চ দিকে ওজন করিয়া দ্রব্য দেওয়া হইয়া থাকে। কিন্তু এরূপ ফেরে ফের মাপে সর্বদাই বিক্রেতার ক্ষতি হইয়া থাকে, একথাটি মিশ্রগণিতের একটি সামান্য সত্য। মহাজনগণ যখন ঝরতি-পড়্‌তি শুক্তি বলিয়া মান ন্যূনতার সমাধা করিবেন, তখন বিজ্ঞান অবহেলাকে কিছু অংশ দিলে সত্যবাদীর কার্য করেন।

রেখাগণিত। লীলাবতী গ্রন্থই রেখাগণিত চর্চার প্রচুর প্রমাণ। লীলাবতী ভারতের গৌরবও বটে, ভারতের কলঙ্কও বটে। কোহিনূর হীরক মুসলমান সম্রাটগণের গৌরব চিহ্নও বটে, কলঙ্কমণিও বটে। লীলাবতী নামোল্লেখে আমাদের একটি কথা মনে পড়িয়াছে, আমরা সেইটি এই স্থানে বলিয়া পাঠককে হাসিতে বা কাঁদিতে অনুরোধ করি না। এক দিন, দীনবন্ধু বাবুর লীলাবতী নাটকের কথা হইতেছিল। বাঙ্গালি, যিনি পিরান গায়ে দেন, তিনিই সমালোচক। একজন বিজ্ঞ সমালোচক একজন আগন্তুককে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, “এই খনার স্ত্রী লীলাবতী বড় (Mathematician) ছিলেন; দীনবন্ধু বাবু তাঁরি বিষয়ে নাটক লিখেছেন। এই পাঁচটা মিষ্টি কথাবার্তা আর কি?” আমরা উপস্থিত ছিলাম; হাসি কাঁদি নাই। তাহাতেই কাহাকেও হাসিতে বা কাঁদিতে বলি না। হা দীনবন্ধো! ভাস্করাচার্য! লীলাবতী! নাটক! কাব্য! সত্য! সমালোচনা! তোমাদের এই দশা হইল! কলঙ্কিনী লীলাবতী যদি না থাকিত, তাহা হইলে আমাদিগকে কখনই লজ্জাকর সমালোচন শুনিতে হইত না।

আয়ুর্বেদ, রসায়ন, উদ্ভিদ্‌তত্ত্ব। এগুলি মনুষ্যের কেবল শরীরধারণ পক্ষে বিশেষ প্রয়োজনীয় ও প্রাচীন ভারতে এগুলির বিশেষ সমাদর ছিল। অনুষ্ঠাতা বাবু মহেন্দ্রলাল সরকারের সাময়িক আয়ুর্বেদ পত্রে তাহার প্রচুর প্রমাণ পাওয়া যায়। অন্য প্রমাণ অনুসন্ধানের প্রয়োজন কি, এত যে অধঃপাতে গিয়াছে—ইয়ুরোপীয় অতি পারদর্শী চিকিৎসকেরা পুরাতন রোগ চিকিৎসায় বৈদ্যদিগের সমকক্ষ হইতে পারিতেছেন না। তৈল চিকিৎসা যে অতি আশ্চর্য পদ্ধতি, তাহাও স্বীকার করিতে হয়। সামান্য বণিকবিপণিতে এক পাত অষ্টাদশ মূল পাচনে দেখিবেন, কত বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন প্রদেশের মূল একত্রিত থাকে। কোন বিশেষ রোগের প্রতীকার জন্য সেইগুলি একত্রিত করিতে প্রাচীন পণ্ডিতগণের কত অধ্যবসায় এবং কত সময় লাগিয়াছে। কিন্তু যেরূপ তাড়িত গতিতে সমস্ত লোপ পাইতেছে, বোধ হয়, এইরূপে চলিলে পরে আর কিছুদিন কপিরাজ ও কবিরাজ শব্দে কেবল বর্ণগতও নয়, অর্থগতও অনেক সাদৃশ্য হইবে।

সঙ্গীত। সঙ্গীতের ক্রিয়াসিদ্ধের উৎকর্ষ দেখিয়া ও সূক্ষ্মরূপে আলোচনা করিয়া আমাদের বিশ্বাস যে, ভারতবর্ষে মুসলমানদিগের সময়ে অতি উন্নত সঙ্গীতবিজ্ঞান ছিল। সোমশ্বর, কাণামাঘ, হনূমত প্রভৃতি মতভেদ দেখিলে বিজ্ঞানের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ হয় বটে, কিন্তু শ্রীরাগে ও ভৈরবে কেহই সাদৃশ্য স্থাপন করেন নাই। করেন নাই কেন? বিজ্ঞান তৎসমুদায়কে পৃথক করিয়া দিয়াছিল, বিজ্ঞানবাক্য অলঙ্ঘনীয়। বৈজ্ঞানিক ভিন্ন এই প্রশ্নের কেহই উত্তর দিতে পারেন না। আধুনিক সঙ্গীত শাস্ত্রজ্ঞানাভিমানিদিগের মধ্যে আমরা অনেককে জিজ্ঞাসা করিয়াছি যে কেন এগুলিকে বিশুদ্ধ ও অন্যগুলিকে জঙ্গলা বলেন? যাঁহারা সূক্ষ্ম জ্ঞানী তাঁহাদের উত্তরের তাৎপর্য এই যে, এরূপ ভেদনির্দেশ আপ্তোদেশমূলক মাত্র। ইহা বৈজ্ঞানিকের উত্তর নহে। বৈজ্ঞানিক বিজ্ঞান ভিন্ন কাহাকেও ওস্তাদ স্বীকার করেন না। মাননীয় ওস্তাদের দোহাই দেখিয়া অত্যন্ত আক্ষেপের সহিত স্বীকার করিতে হইতেছে যে পূর্বতন অতি উন্নত সেই বিচিত্র সঙ্গীতবিজ্ঞান একেবারে লুপ্ত হইয়াছে।

আত্মতত্ত্ব ও মনোবিজ্ঞান। বেদান্তের সূক্ষ্ম গূঢ় ঈশ্বরতত্ত্ব (Theology) ও মায়াবাদমূলক অপূর্ব সংসারতত্ত্ব (Sensational Cosmology), কাপিল সাংখ্যের বেদান্তবিরোধী প্রকৃতিবাদ (Materialism), অক্ষপাদ গোতমের আণ্বীক্ষিকী দর্শন ও ন্যায় শাস্ত্র (Inductive Philosophy and Logic) এবং কণাদের পদার্থ-বিচার (Categorical analysis) এগুলি এক এক বিষয়ের চূড়ান্ত সীমা বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। প্রতিনিধি ডাইরেক্‌টর উড্রো সাহেব নবদীপস্থ ন্যায়-শিষ্যগণের বিতণ্ডাস্মরণ করিয়া লিখিয়াছেন, “আহা, এই বিচারশক্তি কেবল ব্যাপ্তি অব্যাপ্তি অন্যান্যভাব বিতণ্ডার পরিচারিকা না হইয়া যেদিন বস্তুবিচারের সহধর্মিণী হইবে সেদিন কি শুভ দিন হইবে!” যে মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী আশীর্বাদ করিতেছেন, তাঁহাকে কে না নমস্কার করিবে? বিশেষতঃ উড্রো সাহেবকে বাঙ্গালির শুভানুধ্যায়ী বলিয়া সকলেই জানিতেন। আমরা তাঁহাকে নমস্কার করি।

এতদ্ভিন্ন আরো কত বিজ্ঞান ছিল, এখন লোপ পাইয়াছে। সামান্য ভূতের ওঝারা যে এক স্থানে শব্দ করিয়া, সেই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন স্থানাগত শব্দের ন্যায় অনুভূত করাইতে পারে, একথা প্রায় সকলেই জানেন। কতক দূর শব্দবিজ্ঞান (Acoustics) জ্ঞান ব্যতীত এই শব্দানুকরণ বিদ্যার (Ventrilocution) আলোচনা অত্যন্ত দুরূহ বলিয়া বোধ হয়। হয়ত শব্দবিজ্ঞানের কোন স্থূল সত্য উদ্ভাবিত হইয়া থাকিবে। কিন্তু এসকল ছিল, চর্চা ছিল, মহা মহা পণ্ডিত সকল ছিলেন, এখন কি? এখন আক্ষেপের বিষয় এই যে আমাদের আলস্য দোষে, পারতন্ত্র্য দোষে, নানা দোষে, অনেকগুলিরই “প্রায় লোপ হইয়াছে, নামমাত্র অবশিষ্ট আছে।” জিজ্ঞাসা করি, আর কত কাল এভাবে যাইবে?

৩। পূর্বেই বলা হইয়াছে, বিজ্ঞান অবহেলা জন্য আমরা দিন ২ বিদেশীয় জাতিগণের আয়ত্তাধীন হইতেছি; বস্তুবিচারে অক্ষম হইয়া কদন্ন ভোজনে, অপেয় পানে, অপরিশুদ্ধ বায়ু সেবনে দিন দিন দুর্বল হইতেছি। চিকিৎসাশাস্ত্রে নিতান্ত অজ্ঞ হওয়ায় বৈদেশিক প্রথাগত চিকিৎসকগণের হস্তে পতিত হইয়া সর্বদাই জ্বর জ্বালায় কাতর থাকিতে হয়। বিজ্ঞানের ক্রমেই লোপ সম্ভাবনা। “সুতরাং এক্ষণে ভারতবর্ষীয়দের পক্ষে বিজ্ঞানশাস্ত্রের অনুশীলন করা নিতান্ত আবশ্যক হইয়াছে। ও তন্নিমিত্ত ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান সভা নামে একটি সভা কলিকাতায় স্থাপন করিবার প্রস্তাব হইয়াছে। এই সভা প্রধান সভারূপে গণ্য হইবে এবং আবশ্যক মতে ভারতবর্ষের ভিন্ন ভিন্ন অংশে ইহার শাখা-সভা স্থাপিত হইবে।” আমরা এই প্রস্তাবের কায়মনোবাক্যে অনুমোদন করিতেছি। অনুষ্ঠাতার মঙ্গল হউক, অনুষ্ঠান সফল হউক।

৪। “ভারতবর্ষীয়দিগকে আহ্বান করিয়া বিজ্ঞান অনুশীলন বিষয়ে প্রোৎসাহিত ও সক্ষম করা এই সভার প্রধান উদ্দেশ্য।” উদ্দেশ্য অতি মহৎ, তার আর সন্দেহ কি? “আর ভারতবর্ষ সম্পর্কীয় যে সকল বিষয় লুপ্তপ্রায় হইয়াছে” বা হইতেছে “তাহা রক্ষা করা” (যথা মনোরম ও জ্ঞানদায়ক প্রাচীন গ্রন্থ সকল মুদ্রিত ও প্রচারিত করা ইত্যাদি) সভার আনুষঙ্গিক উদ্দেশ্য।” কেবল পুস্তক মুদ্রণ ব্যতীত লুপ্তপ্রায় বিষয়ের অন্যবিধ রক্ষা করা আবশ্যক বোধে আমরা অনুষ্ঠানপত্রের অর্থাৎ শব্দের স্থানে যথা ও পরে ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করিলাম। উদাহরণ দেওয়া যাইতেছে ; যেমন বারাণসীস্থ মানমন্দিরের বৈজ্ঞানিক সংস্কার অথবা প্রাচীন যন্ত্র সকল বা যন্ত্রখণ্ড সকল সংগ্রহ করা, প্রাচীন মুদ্রা, দানফলক বা আদেশফলক সকল সংগ্রহ করা, লুপ্ত বিষয়ের রক্ষার জন্য এগুলি সকলই আবশ্যক। কিন্তু এতদ্ভিন্ন আরো অনেকগুলি আনুষঙ্গিক উদ্দেশ্য হইতে পারে, ও হওয়া উচিতও বোধ হইতেছে। ভারতবর্ষীয়দিগকে বিজ্ঞানে যত্নশীল করিতে হইবে, ও তাঁহারা যত্ন করিতেছেন কি না, তাহা সর্বদা দেখিতে হইবে। আর (কথাটা বলিতে কিন্তু লজ্জা হয়) তাঁহারা বিজ্ঞানে যত্ন করিয়া কিছু আর্থিক উপকার পাইতেছেন কি না তাহাও দেখিতে হইবে। সে বিষয়ে আমাদিগের যাহা বক্তব্য সমাজ স্থাপিত হইলে বলিব।

৫। এই সমুদায় কার্য সম্পন্ন করিতে হইলে অর্থই প্রধান আবশ্যক, অতএব ভারতবর্ষের শুভানুধ্যায়ী, ও উন্নতীচ্ছু জনগণের নিকট বিনীতভাবে প্রার্থনা যে, “তাঁহারা আপন আপন ধনের কিয়দংশ অর্পণ করিয়া উপস্থিত বিষয়ের উন্নিতসাধন করেন।”

৬। অনুষ্ঠাতা মহেন্দ্র বাবু চাঁদা বা স্বাক্ষরদিগের নাম সাদরে গ্রহণ করিতেছেন।

এই অনুষ্ঠানপত্র আজ আড়াই বৎসর হইল প্রচারিত হইয়াছে, এই আড়াই বৎসরে বঙ্গসমাজ ৪০ চল্লিশ সহস্র টাকা স্বাক্ষর করিয়াছেন। মহেন্দ্র বাবু লিখিয়াছেন যে, এই তালিকাখানি একটি আশ্চর্য দলিল। ইহাতে যেমন কতকগুলি নাম থাকাতে স্পষ্টীকৃত হইয়াছে, তেমনি কতকগুলি নাম না থাকাতে উজ্জ্বলীকৃত হইয়াছে। তিনি আর কিছু বলিতে ইচ্ছা করেন না।

আমরা উপসংহারে আর গোটা দুই কথা বলিতে ইচ্ছা করি। বঙ্গধনীগণ, আপনারা মহেন্দ্র বাবুর ঈষৎ বক্রোক্তি অবশ্যই বুঝিয়া থাকিবেন। তবে আর কলঙ্কভার শিরে কেন বহন করেন? সকলেই অগ্রসর হউন। যিনি এক দিনে লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করেন, তিনি কেন পশ্চাতে পড়েন? পুত্রকন্যার বিবাহে যাঁহারা লক্ষ লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করেন, তাঁরা কেন নিশ্চিন্ত বসিয়া থাকেন। উড্রো সাহেব ভয়ানক বিজ্ঞানগুণ-অস্বীকারদোষ বঙ্গসমাজ-মস্তকে আরোপ করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। একবার মুক্ত হস্তে দান করিয়া সমাজ স্থাপন করিয়া স্বীয় ভ্রম দূর করুন। বঙ্গীয় যুবকগণের অবস্থার উন্নতি সাধন করুন; বঙ্গের শিল্পবিদ্যার পুনরুদ্ধার করুন। মহাত্মা উড্রো সাহেবকে বলি, তিনি কাম্বেল সাহেবকে চিঠিতে যা বলিয়াছেন, তাহার কথায় আমাদের কাজ নাই, তিনি কেন একবার স্বজাতীয়গণকে এই মঙ্গলকর কার্যের সাহায্য করিতে বলুন না। যদি তালিকাতে একটিও শ্বেতাঙ্গের নাম না প্রকাশিত হয়, তাহা হইলে কত আক্ষেপের বিষয় হইবে।

—‘বঙ্গদর্শন’, ভাদ্র ১২৭৯

(*) আছিল দেউল এক পর্বত প্রমাণ।
ক্রোধ করি ভাঙ্গে তাহা পবন নন্দন ||
অর্ধেক পঙ্কেতে তার তেহাই সলিলে।
দশম ভাগের ভাগ সেবালার দলে ||
উপরে বায়ান্ন গজ দেখ বিদ্যমান।
করহ সুবোধ সবে দেউল প্রমাণ ||

___________‎‎‎‎‎‎‎‎‎‎

বিরহিণীর দশ দশাসংযোজনী

প্রথম দশা দিনে,
বেরি বেরি রোওল
শেজে পাড়ি কাঁদে ভূমি লুটি।
দ্বিতীয় দশা দিনে,
আঁখি মেলি হেরল,
শেজ ছাড়ি গা ভাঙ্গিল উঠি৷৷
তৃতীয় দশা দিনে,
মৃদু মৃদু হাসিল,
বলে কোথা গেলে প্রাণনাথ।
চউঠ দশা দিনে,
সিনান করি আওল,
হাঁড়ি পাড়ি খাওল পান্তা ভাত৷৷
পঞ্চম দশা দিনে,
বান্ধি চারু কবরী,
ঢাকাই শাড়িতে দিল ফের।
ষষ্ঠম দশা দিনে,
পিঠা পুলি বানাওল,
কাঁদিতে ২ তার গিলিল তিন সের৷৷
 
সপ্তম দশা দিনে,
সজিনা খাড়া রাঁধিল
বলে প্রাণ বঁধূ কোথা গেলে।
যে খাঁড়া রেঁধেছি ভাই,
তুমি বঁধূ কাছে নাই,
যদি পেট ফাঁপে একা খেলে৷৷
অষ্টম দশা দিনে,
বিরহ বিষাদিনী,
মন দুঃখে কিনিল ইলিশ।
তিতিয়া নয়ন জলে,
ভাজায় ঝোল অম্বলে,
খায় ধনী খান বিশ ত্রিশ৷৷
নবম দশার দিনে,
পেট ফেঁপে ঢাক হলো,
আইল কানাই কবিরাজ।
সই বল কর্মভোগ,
এ ঘোর বিরহ রোগ,
কবিরাজের নাহি ইথে কাজ৷৷
দশম দশা দিনে,
বিরহিণী মরে নরে,
আই ঢাই বিছানায় পড়ি।
কাতরে কহিছে সতী,
কোথা পাব প্রাণপতি,
কোথা পাব পাচকের বড়ি৷৷
বিরহীর দশ দশা,
পন্ পন্ করে মশা,
মাছি উড়ে ছেলে কাঁদে কোলে।
চাকরাণীর চীৎকার,
সইসাঙ্গতির টিট্‌কার,
খেদে কবি ছন্দোবন্ধ ভোলে
 
—‘বঙ্গদর্শন’, ফাল্গুন, ১২৭৯

নাটিকাঅসম্পূর্ণ রচনা

DRAMATIS PERSONÆ

রামধন-রামকৃষ্ণ-কলাবতী-দিবা-নিশা

প্রথম অঙ্ক
SCENE I
প্রতাপনগরের রাজবর্ত্ম
রামধন-রামকৃষ্ণ
রামধন। কিসের এত গোল?

[নেপথ্যে বহু লোকে “জয় জয় কলাবতী”]

ও কিসের জয়ধ্বনি?

রামকৃষ্ণ। জান না রাণী কলাবতী স্নান করিয়া যাইতেছেন।

রামধন। রাণী স্নান করিয়া যাইতেছেন, তার এত জয়ধ্বনি কেন?

[নেপথ্যে “জয় জয় রাণীজিকি জয়”]

ঐ শুন।

রামকৃষ্ণ। তুমি বিদেশী তাই অবাক্ হইতেছ। রাণী কলাবতীকে এ নগরের লোক বড় ভক্তি করে। বড়ই ভালবাসে।

রামধন। কেন রাণীর কিছু বিশেষ গুণ আছে?

রামকৃষ্ণ। তা আছে-রাণী অতিশয় দানশীলা আর বড় প্রজাবৎসলা। যার যে দুঃখ থাকে, রাণীকে জানাইতে পারিলেই-হইল-তার দুঃখ ঘুচিবে।

[নেপথ্যে “জয় জয় মা কলাবতীর জয়”]

ঐ শোন সকলেই রাণীকে মা বলিতেছে, তিনি প্রজামাত্রেরই মা’র মত। তাঁর গুণেই এখানকার প্রজারা এত সুখী।

রামধন। বটে! তবে রাজার এত সুখ্যাতি কেন?

রামকৃষ্ণ। রাণীর গুণে।

রামধন। তাঁহাকে দেখিতে পাওয়া যায়? তিনি কি প্রাচীনা।

রামকৃষ্ণ। না, তিনি বড় অল্পবয়স্কা তবে সকলের মা বলিয়া সকলকেই দেখা দেন। চল না আমরা মাতৃ-দর্শনে যাই।

রামধন। চল।

উভয়ে নিষ্ক্রান্ত

SCENE II
রাজার অন্তঃপুর
রাজা রাজেন্দ্র একা
রাজা। কে না জানে আকাশে মেঘ উঠে? তবে কেন এত ভাবি-মেঘ উঠে মেঘ ছাড়ে। এ মেঘও উড়িয়া যাইবে-তবে কেন এত চিন্তা করি? মনে করিয়াছিলাম এ নির্ম্মল আকাশে কখনও বুঝি মেঘ উঠিবে না, আমি মূর্খ তাই এত ভাবি। হায়! কোথা হইতে আবার এ প্রবল শত্রু দেখা দিল?

(কলাবতীর সজ্জিতা সখীদিগের প্রবেশ)

তোরা কেন গো? এত সাজগোজ যে।

‍দিবা। আমরা নাচব।

রাজা। খানখা নাচবে কেন গো?

নিশা। রাণী কলাবতীর হুকুম। [নৃত্য আরম্ভ]

রাজা। কেন নাচের হুকুম কেন?

দিবা। আগে নাচি। [নৃত্য]

রাজা। আগে বল্।

নিশা। আগে নাচি।

রাজা। আ মর! তোর পা যে থামে না-জোর করে নেচে যাবি নাকি-আমি দেখিব না-এই চোক বুজিলাম। [চোখ বুজিয়া]

দিবা। দেখুন মহারাজ! আপনাকে মুখ ভেঙ্গাচ্চে।

নিশা। দেখুন মহারাজ, আপনাকে কলা দেখাচ্চে।

রাজা। মরগে যা তোরা! আমি চোক চাব না।

নিশা। আচ্ছা কান তো খোলা আছে।

(করতালি দিয়া গীত)
নয়ন মুদিয়া, দেখিনু সজনী,
কানুর কুটিল রূপ।
গলেতে বাঁধিয়া পিরীতি কলসী
সাগরে দিনু যে ডুব।
রাজা। শুনবো না। [কর্ণে হস্তার্পণ]

দিবা। তবে ফুলের ঘ্রাণ নিন।

(কবরী হইতে পুষ্প লইয়া রাজার নাসিকার নিকট ধারণ)

রাজা। নিঃশ্বাস বন্ধ করিলাম।

নিশা। চক্ষু কর্ণ নাসিকা বন্ধ। রসনা বাকি আছে-চল ভাই রান্নামহলে খবর দিই।

রাজা। মুখ বুজিয়া থাকিব।

নিশা। তবে বড় মা ঠাকুরাণীকে ডেকে দিই।

রাজা। কেন সে ভয়ঙ্কর ব্যাপার কেন?

নিশা। ইন্দ্রিয়ের মধ্যে আপনার বাকি আছে পিঠের চামড়া।

(কলাবতীর প্রবেশ)

কলা। আ মলো, তোরা বড় বাড়ালি, দূর হ!

[সখীদ্বয় নিষ্ক্রান্ত]

রাজা। দেখত কলাবতী, তোমার লোকজন আমায় কিছু মানে না, আমার উপর বড় অত্যাচার করে!

কলা। কি অত্যাচার করেছে মহারাজ? একটু হাসিয়াছে? সেটা আমারই অপরাধ। তোমার মুখে কয় দিন হাসি দেখি নাই বলিয়া আমি ওদের পাঠাইয়া দিয়াছিলাম।

রাজা। আমার মাথায় পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে-আমি হাসিব কি?

কলা। কি পাহাড় মহারাজ! আমায় ত কিছু বল নাই। যা ইচ্ছা করিয়া বল না-তা সাহস করিয়া জিজ্ঞাসা করি না। কি পাহাড় মহারাজ! পড়িলে তোমার একার ঘাড়ে পড়িবে না।

রাজা। পাহাড় আর কিছু নয়-খোদ দিল্লীশ্বর ঔরঙ্গজেব। এই ক্ষুদ্র রাজ্যের উপর নজর পড়িয়াছে, বাদশাহের যাহাতে নজর পড়ে তাহা তিনি না লইয়া ছাড়েন না।

কলা। এ সম্বাদ কোথা পাইলেন?

রাজা। আত্মীয়লোকে দূতমুখে বলিয়া পাঠাইয়াছে। বিশেষ, ঢাকায় সুবাদার অনেক সৈন্য জমা করিতেছেন। লোকে বলে প্রতাপনগরের জন্য।

কলা। কেন আমরা কি অপরাধ করিয়াছি?

রাজা। অপরাধ বিস্তর। প্রতাপনগর ধনধান্য পূর্ণ-লোক এখানে দারিদ্র্যশূন্য- আর আমরা হিন্দু! হিন্দুর ঐশ্বর্য্য বাদশাহের চক্ষুশূল।

কলা। যদি এ সম্বাদ সত্য হয়, তবে আমরাও যুদ্ধের উদ্যোগ না করি কেন?

রাজা। তুমি পাগল! দিল্লীশ্বরের সঙ্গে যুদ্ধ কি আমার সাধ্য! জয় কি হইবে?

কলা। না, তবে বিনা যুদ্ধে মরিব কেন?

রাজা। দেখি যদি বিনা যুদ্ধে কার্য্যোদ্ধার হয়। আমার ইচ্ছা একবার ঢাকায় যাই। আপনি সুবাদারের মন বুঝি, কোন ছলে যদি বশীভূত করিতে পারি করি।

কলা। এমন কর্ম্ম করিও না-ঔরঙ্গজেবের নায়েবকে বিশ্বাস কি? আর আসিতে দিবে না।

রাজা। সম্ভব-কিন্তু তাহাতে তাহার লাভ হইবে কি?

কলা। রাজহীন রাজ্য সহজে হস্তগত করিবে।

রাজা। আমি গেলে তুমি রাজ্যের রক্ষক থাকিবে।

কলা। ছি! স্ত্রীলোকের বাহুতে বল কি?

রাজা। এখানে বাহুবলের কাজ নয়। বুদ্ধিবলই ভরসা। প্রতাপনগরে বুদ্ধিবল তুমি একা।

কলা। মহারাজ, আপনাকে যাইতে দিতে আমার মন সরিতেছে না।

রাজা। থাকিলেই কোন মঙ্গল! যুদ্ধেই কোন মঙ্গল!

কলা। মারহাট্টা যুদ্ধ করিতেছে-আমরা কি মানুষ নই?

রাজা। না, আমরা মানুষ নই। শিবাজীর কাজ কি আমার দ্বারা সম্ভবে? আমি যাওয়াই স্থির করিতেছি। এখন শয়নঘরে চলিলাম।

[নিষ্ক্রান্ত]

কলাবতী। (স্বগত) বিধাতা, যদি আমায় স্ত্রীলোক করিয়াছিলে তবে আমায়- দূর হৌক সে কথায় এখন আর কাজ কি? হায়! আমি রাণী কিন্তু রাজা কই? রাজা অভাবে প্রতাপনগর রক্ষা হইবে না। হায়! রাণী হইলাম ত রাজা পাইলাম না কেন?

(দিবার প্রবেশ)

(চক্ষু মুছিয়া) কি লো দিবি?

দিবা। এই কাগজটুকু কুড়িয়ে পেয়েছি। [এক পত্র দিল]

কলা। (পড়িলেন) “আমি রাজা রাজেন্দ্রের আজিও প্রবল শত্রু-প্রতাপনগর ধ্বংস করিয়া তোমাকে গ্রহণ করিব। নইলে ভালোয় ভালোয় এসো।”

এ পত্র কোথায় পাইলি?

দিবা। আজ্ঞে আমি কুড়িয়ে পেয়েছি।

কলা। তোকে ফাঁসি দিব। আবশ্যক হইলে আমি হুকুম দিই, তা তুই জানিস?

দিবা-জানি-তা আমি কুড়িয়ে না পেলুম তা কোথা পেলুম?

কলা। কোথা পেলি? তুই হাতে হাতে নিয়েছিস!

দিবা। মাইরি রাণীমা, আমি হাতে হাতে নিই নে।

কলা। তবে কোথায় পেলি বল, নইলে ফাঁসি দিব।

দিবা। আমি পায়রার গলায় পেয়েছি।

কলা। সে পায়রা কোথায়?

দিবা। পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছি।

কলা। কালি কলম নিয়ে আয়-জবাব লেখ্।

দিবা। কালি কলম আছে-কি লিখিব।

কলা। লেখ্, “আমি তোমার পরম শত্রু-তোমায় ধ্বংস করিয়া প্রতাপনগর রক্ষা করিব।” লেখা হইল?

দিবা। লিখেছি-পায়রার গলায় বেঁধে দিয়ে আসি?

কলা। দে গিয়ে।

দিবা। হাঁ রাণীমা এ কে মা-

কলা। চুপ! কথা মুখে আনিলে মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে দিব। [দিবা নিষ্ক্রান্ত]

কলা। পায়ে কাঁটা ফুটিলে কাঁটা দিয়ে বাহির করিতে হয়, বুঝি আমাকে তাহাই করিতে হইবে।

SCENE III
রাজার অন্তঃপুর
দিবা-নিশা
দিবা। রাজা ঢাকায় চলিল কেন ভাই?

নিশা। তোর জন্য ঢাকাই কাপড় আন্‌তে।

দিবা। আমি ত এমন হুকুম দিই নে, আমার যে ঢাকাই কাপড় আছে।

নিশা। তবে তোর বর আন্‌তে।

দিবা। কেন এ দেশে কি বর পাওয়া যায় না?

নিশা। এ দেশে তেমন দাড়ি পাওয়া যায় না-তোমাকে একটা নেড়ে বর এনে দেবে।

দিবা। তা তার জন্য আর রাজার নিজে যাবার দরকার কি? আমায় বললে আমি একটা খুঁজে পেতে নিতুম। না হয় গোবিন্দ বখশীকে একটা পরচুলো দাড়ি পরিয়ে ঘরে নিয়ে আসতুম।

নিশা। আচ্ছা, বখশী মশাইকে বলে রাখ্‌ব।

দিবা। দূর হ পাপিষ্ট-তোর কাছে কোন কথাই বলবার যো নাই। তা যাক্- সত্য সত্য রাজা ঢাকায় চলল কেন?

নিশা। কি জানি কেন-রাজা রাজড়ার মন তুমি আমি কি বুঝ্‌ব।

দিবা। তা, রাজা কি ফিরিবে না কি?

নিশা। সে কি কথা? অমন কথা মুখে আনতে আছে! দিবা। রাণী কলাবতী অত কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়েছে কেন?

নিশা। স্বামী বিদেশে গেলে একটু কাঁদ্‌তে হয়।

দিবা। দূর! স্বামী ছেড়ে স্বামীর বাবার জন্য আমি কাঁদি নে।

নিশা। তোর সাত পুরুষের ভিতর স্বামী নাই, তুই আবার কাঁদবি কার জন্য? বরং রাজার জন্য একটু কাঁদিস ত কাঁদ।

দিবা। না ভাই তা পারিব না। বরং মনের দুঃখে বসে বসে লুচি মণ্ডা খাই গে চল।

নিশা। তাও মন্দ নয়।

দ্বিতীয়াঙ্ক
SCENE I
সুবাদার-রাজা
রাজা। আমার কি অপরাধ? কি জন্য দিল্লীশ্বর আমার উপর পীড়ন করিতে উদ্যত?

সুবা। আপনি মুসলমানের দ্বেষক। বাদশাহ মুসলমানের ধর্ম্মরক্ষক। সুতরাং বাদশাহ-

রাজা। আমি কিসের মুসলমানের দ্বেষক? আমার রাজ্যে হিন্দু মুসলমান তুল্য-

সুবা। প্রতাপনগরে একটি মসজীদ নাই-মুসলমানে নমাজ করিতে পায় না।

রাজা। আমি মসজীদ প্রস্তুত করিয়া দিব।

সুবা। প্রতাপনগরে একটি কাজি নাই-মুসলমানের বিচার কি হিন্দুর কাছে হয়?

রাজা। আমি কাজি নিযুক্ত করিব।

সুবা। মহারাজ-আপনি যদি বাদশাহের এরূপ বশ্যতাপন্ন হন, তবে বাদশাহ কেন আপনাকে রাজ্যচ্যুত করিবেন? কিন্তু আসল কথা এখনও বাকি আছে- প্রতাপনগরে মুসলমানে জবাই করিতে পায় না-তার কি হইবে?

রাজা। গোরু ভিন্ন অন্য জবাইয়ে আপত্তি করিব না।

সুবা। কিন্তু গোরুই আসল কথা।

রাজা। হিন্দু হইয়া গোহত্যা করিতে দিব কি প্রকারে?

সুবা। তবে হিন্দুয়ানি ত্যাগ করুন।

রাজা। ধর্ম্মত্যাগ করিব? ইহকাল পরকাল খোয়াইব? এ কথাও কানে শুনিতে হইল।

সুবা। ইহকাল নষ্ট হইবে না। আপনি ইসলামের ধর্ম্ম গ্রহণ করিলে বরং ইহকালে সুখী হইবেন। রাজ্য বজায় থাকিবে এবং আরও বাড়াইয়া দিব। আর পরকালও যাইবে না। ইসলামই সত্য ধর্ম্ম-দেখুন কত বড় বড় হিন্দু এখন মুসলমান হইতেছে। তাহারা কি না বুঝিয়া ধর্ম্মত্যাগ করিতেছে? বরং আপনার যদি সন্দেহ থাকে, তবে আমি ভাল ভাল মোল্লামুফ্‌তি আপনার কাছে পাঠাইয়া দিতেছি। তাহাদের সঙ্গে বিচার করুন-বিচারে যদি ইসলাম সত্য ধর্ম্ম বলিয়া বোধ হয়, তবে গ্রহণ করিবেন ত?

রাজা। ইচ্ছা হয় মোল্লা মুফ্‌তি পাঠাইবেন। কিন্তু কিছু ফলোদয় সম্ভাবনা নাই। সম্প্রতি আমি যাহা নিবেদন করিলাম, অনুগ্রহ করিয়া বাদশাহের নিকট জানাইবেন। গোহত্যা ভিন্ন আর সকলেই আমি সম্মত-বার্ষিক কর দিতেও সম্মত। আজ আমি বিদায় হইব-যে হুকুম হয় অনুগ্রহ করিয়া জানাইবেন।

সুবা। কোথা যাইবেন?

রাজা। অনেক দিন আসিয়াছি, স্বদেশে যাইব।

সুবা। সে কি? আপনার শুভাগমনের সম্বাদ আমি দিল্লীতে এত্তেলা করিয়াছি। সেখান হইতে খেলওয়াত আসিবে-তাহা না গ্রহণ করিয়া কি যাওয়া হয়।

রাজা। বড় অনুগৃহীত হইতেছি কিন্তু আমার অবর্ত্তমানে রাজ্য বিশৃঙ্খল হইতেছে।

সুবা। নাচার-আপনাকে অবশ্য অপেক্ষা করিতে হইতেছে। আপনার ফৌজ সকল বিদায় দিন।

রাজা। সে কি আমাকে কয়েদ রাখিতে চাহেন?

সুবা। ও সব কথা কেন? তবে দিনকত আপনাকে এখানে থাকিতে হইবে। দিল্লীর হুকুম না আসিলে ছেড়ে দিতে পারিব না।

রাজা। (স্বগত) হায়! কলাবতী তুমি যা বলিয়াছিলে তাহাই হইল। (সুবাদারকে) যাহা হুকুম হয় তাহাই তামিল করিব।

সুবা। তছলীম। [সুবাদার নিষ্ক্রান্ত]

রাজা। কয়েদই ত হইলাম। প্রমথ-প্রমথ

(প্রমথের প্রবেশ)

আমার আজকাল ফিরিয়া যাওয়া হইতেছে না, তুমি প্রতাপনগরে এই সম্বাদ লইয়া যাও।

প্রমথ। যাইব কি প্রকারে? সকল পথে পাহারা-আমাদের কয়েদ করিয়াছে।

রাজা। আমার শিপাহী সব কোথা?

প্রমথ। নবাবের লোকে তাহাদের হাতিয়ার কাড়িয়া লইয়াছে-তাহাদিগকে প্রতাপনগরে ফিরিয়া যাইবার হুকুম হইয়াছে।

রাজা। ভাল, তাহারাই গিয়া সম্বাদ দিবে।

প্রমথ। দিলেই বা কি হইবে।

SCENE II
কলাবতী-নিশা
কলা। আজ একুশ দিন হইল মহারাজ ঢাকায় গিয়াছেন, আজও কই কোন সম্বাদ ত পাইলাম না।

নিশা। হাঁ রাণীমা, রাজরাণীতেও কি এমনি কর্র্যে দিন গণে?

কলা। কই আমি দিন গণিলাম?

নিশা। কাঁদ কেন মা, আমি ত এমন কিছু বলি নাই।

কলা। নিশা, তুই একবার শহরের ভিতর একটা শিয়ানা লোক পাঠাইতে পারিস্-অবশ্য কেহ কোন সম্বাদ শুনিয়াছে, কেন না ঢাকায় ঢের লোক যায় আসে। আমি এত লোক পাঠাইলাম, কেহ ত ফিরিল না। বোধ হয়, মন্দ সম্বাদই আসিয়াছে-লোকে সাহস করিয়া আমার সাক্ষাতে বলিতে পারিতেছে না।

নিশা। আপনাকে ব্যস্ত দেখিয়া আমি আপনার বুদ্ধিতেই শহরে অনুসন্ধান করিতে লোক পাঠাইয়া দিলাম-কিন্তু-

কলা। কিন্তু কি?

নিশা। লোকে বলে যে মহারাজকে সুবাদার আটক করেছে-অমন কর কেন মা! এই জন্য ত বলি নাই। একটু শোও আমি বাতাস করি। উড়ো কথায় বিশ্বাস কি?

(কলার শয়ন)

কলা। বিশ্বাস সম্পূর্ণ। আমি আগেই বলিয়াছিলাম যে গেলে তাঁকে আটক করিবে। নিশি! এখন আমার দশা কি হইবে! (রোদন)

নিশা। কাঁদিলে কি হবে মা। আমাদের সকলেরই ত এক দশা হইবে। আমরাও নিরাশ্রয় হইলাম-এখন মুসলমানের হাতে জাতি মান প্রাণ সব যাবে।

কলা। কি বলিলি সবার এক দশা? তোদের যে রাজা মাত্র-আমার যে স্বামী। তুই কি জানিস স্বামী কি ধন!

নিশা। তা বটে। রাজ্য যায় তবু প্রাণটা থাকিলে আমরা বজায় থাকিব। ভাল মা, এক কাজ কর না কেন? রাজার কাছে কেন লোক পাঠাও না যে সুবাদারকে রাজ্য ছাড়িয়া দিয়া আসুন-আমরা না হয় তাঁকে গহনা পত্র বিক্রয় করিয়া খাওয়াইব। কাঁদ কেন মা এ কথায়?

কলা। তুই কেন আমায় অপমান করিস্? কি! আমার স্বামীকে আমি রাজ্যত্যাগ করিয়া প্রাণ বাঁচাইতে বলিব! নিশা-তোদের ভয় হইয়া থাকে তোরা চলিয়া যা-আমার স্বামী রাজা-তিনি রাজার কাজ করিবেন।-কিসের গোল ঐ?

[নেপথ্যে বহু লোক “জয় মা কলাবতীর জয়”]

আজিকার দিনে কে বলে কলাবতীর জয়?

(দিবার প্রবেশ)

দিবা। মহারাণী! নগরের সকল প্রজা আসিয়া রাজবাড়ী ঘেরিল।

কলা। কি হয়েছে?

দিবা। সকলে বলিতেছে ঢাকার সুবাদার রাজাকে কয়েদ করিয়াছে।

কলা। তার পর প্রজারা কি বলে। [নেপথ্যে “মহারাণী কলাবতীর জয়”] ওরা কি চায় দিবা?

দিবা। আপনি স্বকর্ণে শুনুন।

কলা। প্রজারা আমার পুত্র, আমার [নিকট] অবারিতদ্বার। প্রধানদিগকে আমার কাছে ডাকিয়া আন।

(দিবার প্রস্থান। কতিপয় নগরবাসীর সহিত পুনঃপ্রবেশ)

প্রজাবর্গ। জয় কলাবতীর জয়।

কলা। কি চাও বাবা তোমরা?

১ম প্রজা। মা, আমাদের রাজা কোথায়?

২য় প্রজা। মা, আমাদের রাজাকে নাকি দুষ্ট যবন কয়েদ করিয়াছে? মা, আমাদের বাহুতে কি বল নাই যে বাপের উদ্ধার করি? -বঙ্কিম-কণিকা, পৃ,১- ২২।

ভিক্ষাঅসম্পূর্ণ রচনা

আমি ভাবিয়া চিন্তিয়া স্থির করিয়াছি, এ যাত্রা ভিক্ষা করিয়া কাটাইব। আমাদের দেশ-ভাল দেশ, ভিক্ষায় বড় মান ; যে নির্ব্বোধ, সে পরিশ্রম করুক, আমি ভিক্ষা করিব।

কেহ মনে করিবেন না যে, আমি অন্ধ, কি খঞ্জ, কি বধির, কি পীড়িত, কি দীনদুঃখী। এ দেশে ভিক্ষা করিতে সে সব আড়ম্বরের প্রয়োজন কি? ভিক্ষা করিলেই হইল।

কে ভিক্ষা না করে? দীন-হীন, ধনবানের নিকট ভিক্ষা করে, ধনবানও দীন-হীনের নিকট ভিক্ষা করে। বড় বড় প্রকাণ্ডোদর জমীদারেরা দুঃখী প্রজাদের কাছে ভিক্ষা করেন ; আজ পিতৃশ্রাদ্ধ, কাল পুত্রের যজ্ঞোপবীত, তার পরদিন কন্যার বিবাহ। প্রজার নিকট ভিক্ষা না করিলে এ সব কর্ম্মে মান থাকে কই? বড় বড় কুলীন, তাঁহারা স্ত্রীর কাছে ভিক্ষা করিয়া উদর পরিপূরণ করেন, নহিলে নবধা কুললক্ষণ উজ্জ্বল হয় না। বড় বড় অধ্যাপক আচার্য্য গোস্বামীরা ভিক্ষা করেন, নহিলে পরকালের কাজ হয় না। তাঁহারা একান্ত পরহিতৈষী সন্দেহ নাই।

কে ভিক্ষা না করে? আমাদের দেশে সকলেই ভিক্ষা করে, কেবল ভিক্ষুক বিশেষে আর ভিক্ষার সময় বিশেষে, ভিক্ষার বিশেষ বিশেষ নাম আছে মাত্র। জমীদারের ভিক্ষার নাম মাঙ্গন, তাঁহাদের অনুচরদিগের ভিক্ষার নাম পার্ব্বণী, ভব-পারাবারের ত্রাণকর্ত্তা গুরুবর্গের ভিক্ষার নাম প্রণামী, আত্মীয় সমতুল্য ব্যক্তির ভিক্ষার নাম বিদায়। বরযাত্রীর ভিক্ষার নাম গণ, বরের বাপের ভিক্ষার নাম পণ, যে গ্রামে বিবাহ সে গ্রামের ভদ্রলোকদিগের ভিক্ষার নাম ডেলাভাঙ্গানি, আর তাহাদের যুবতীদের – অবলাবালাদিগের ভিক্ষার নাম -সেজতোলানি। নাছোড়বন্ধ ব্রাহ্মণ ভিখারীর ভিক্ষার নাম বার্ষিক। যাঁহার বাড়ীতে ঠাকুরদেবতা আছেন, তাঁহার ভিক্ষার নাম দর্শনী। রাজরাজড়ার ভিক্ষার নাম নজর ; কেবল খঞ্জ দীন দুঃখীর ভিক্ষার নাম ভিক্ষা। না হবেই না কেন? তাহারা যে পরের ধন চাহিয়া লইবার বাসনা করে, তাহাদের এত বড় যোগ্যতা!

ভিক্ষা আমাদের সংস্কার। সকল জাতির একটা একটা বিশেষ সংস্কার থাকে ; আমাদের সংস্কার ভিক্ষা। জন্মগ্রহণ করিয়াই ভিক্ষা পাই, তারে বলি যৌতুক। তার পর অন্নপ্রাশন ; অন্নপ্রাশনেও যৌতুক। ব্রাহ্মণের তার পর উপনয়ন, উপনয়নে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে না করিলে ব্রাহ্মণ হয় না। পরে বিবাহ, তখন সোণায় সোহাগা, নববধূর চাঁদমুখ দেখাইয়া ভিক্ষা লই। শেষ মৃত্যু ; সে ব্যাপারটায় বড় বাঁধাবাঁধি,-যম ছেড়ে দেয় না, সুতরাং পুত্র গলায় কাচা বাঁধিয়া আমাদের জন্য ভিক্ষায় বাহির হয়।

আমাদের চক্ষে ভিক্ষাবৃত্তির অপেক্ষা আর শ্রেষ্ঠ বৃত্তি নাই। সেই জন্য আমাদের পূজ্য-দেবতামধ্যে প্রধান-মহাদেবকে ভিখারী সাজাইয়াছি। আর বিষ্ণু বামন-অবতারে ভিক্ষা করিয়া ত্রিলোক রক্ষা করিলেন। এখনও কোন দেবমূর্ত্তি দর্শন করিতে গেলে ঠাকুরকে পয়সাটি না দিলে দর্শন মঞ্জুর হয় না। যখন বর্ণবিভাগ বদ্ধমূল হইল, তখন ইতর বর্ণ ইতর বৃত্তি অবলম্বন করিল ; যথা,-বৈশ্যে বাণিজ্য, ক্ষত্রিয়ে রাজত্ব, শ্রেষ্ঠ বর্ণ ব্রাহ্মণের বৃত্তিও শ্রেষ্ঠ হইল,-তিনি ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিলেন। অতএব ইহা স্থির যে, এ সংসারে ভিক্ষাই সার পদার্থ।

ভিক্ষায় আর এক সুখ আছে,-আদায়ের সুখ। খাতক যদি আমার কর্জ্জ শোধ না দেয়, তবে মহাকষ্ট ; তাহার নামে নালিশ করিতে হয়। প্রভু যদি বেতন না দেয়, তবে আরও জঞ্জাল ; উপায় নাই বলিলেই হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এমনই সুনীতি যে, ভিক্ষা আদায়ের নানা শাসন আছে। প্রজা যদি জমীদারকে ভিক্ষা না দেয়, জরিমানা কর-মিথ্যা নালিশ কর-চাল কাটিয়া উঠাইয়া দাও। শিষ্যযজমান যদি ব্রাহ্মণকে ভিক্ষা না দেয়, অভিসম্পাত কর-বেটার সবংশে নির্ব্বংশ দাও ; তাহাতেও না দেয়, পইতা ছেঁড়-আর একটা পইতা কিনিয়া পরিও ; ইচ্ছা হয় তেরাত্রি কর, পার যদি ত লুকাইয়া লুকাইয়া কিছু কিছু আহার করিও ; উনানে পা পুরিও, কিন্তু দেখো, উনানে যেন আগুন না থাকে। আর যদি ব্রাহ্মণ না হইয়া জাতি-ভিখারী হও, তবে ধণ্বা দিও, মারে কাটে দ্বার ছেড়ো না। শ্রাদ্ধের সময় ভিক্ষা করিতে গেলে, যার শ্রাদ্ধ তার নরক দেখাইতে ভুলিও না। পশ্চিম দেশে আর একটা প্রথা আছে, সেইটা সর্ব্বাপেক্ষা ভাল,-তাহারা ঝাঁটা মারিয়া ভিক্ষা করে ; পার ত দাতাকে প্রথমে সেইরূপ সমাদরসূচক অভ্যর্থনা করিও।

ব্রাহ্মণ-ভিখারী! তোমাকে আরও দুই একটা পরামর্শ দিবার আছে। তুমি ভিক্ষুক-পূজ্য ব্যক্তি, যাহার দান লইবে, তাহার সহিত একাসনে বসিও না-উচ্চাসনে বসিও ; সে ব্যক্তি দাতা বইত নয়, তোমার সমানস্পর্দ্ধী? দাতার যদি সহজে মন না ভিজে, তাহার মাথায় শ্রীচরণখানি তুলিয়া দিও ; ইহাতে কোন ক্রমেই সঙ্কোচ করিও না। ভিখারীর পাদপদ্ম কখন কখন কাদা, গোবর ও বিষ্ঠায় পরিপূর্ণ থাকে-তথাপি দাতার মাথায় সোণার কিরীট থাকিলেও তাহার উপর পদ স্থাপন করিতে সঙ্কোচ করিও না। তাহাতে কার্য্যোদ্ধার না হয়, ভ্রূভঙ্গী করিও-ফিরিয়া দাঁড়াইও ; আগে বলিও, “দেবে না কেন? তাহাতেও না দেয়, অভিসম্পাত করিও ; পুত্রগুলির অমঙ্গলটা আগে দেখাইও। তবু কিছু না দেয়, বাপ চৌদ্দপুরুষকে গালি দিয়া চলিয়া আসিও। কার্য্যোদ্ধারের আর এক উপায় আছে,-ডিপে-হাতে বৈদ্য, কি পাঁজি-হাতে এদৈবজ্ঞ ইত্যাদি লোকের দেখা পাইলে দুই চারিটি উদ্ভট কবিতা শিখিয়া রাখিও ; কষ্ট করিয়া অর্থ লিখিবার প্রয়োজন নাই। প্রথমে আসন গ্রহণ করিয়াই দুই একটা কবিতা ছাড়িও ; পরে উপস্থিত কথার সহিত সংলগ্ন বা অসংলগ্ন যা হোক একটা অর্থ করিয়া দিও। তসর কাপড়খানা আর ফোঁটার আড়ম্বরটা চাই, আর যখন তখন তেমনি দাঁও ফাঁদিয়া বসিও। সুদের সুদ ছাড়িও না,-শাস্ত্রসম্মত দানটা হইলে দক্ষিণাটা না এড়ায়। যদি শুনিতে পাও যে, অমুক বাবুদের বাড়ী একটা বড় ক্রিয়া, সেই সময় কালে গোহালের গরুগুলা বাহিরে বাঁধিয়া তথায় টোল ফাঁদিয়া বসিও ; মামাত পিসিতত ভাইগুলাকে সাধিয়া পাড়িয়া দিন দুই তথায় পুরিও। পরে পত্রখানা জুটিলে সভায় উপস্থিত হইও। দেখ, গ্রামের বার্ষিক সমাজিকগুলিন যেন না ফস্কায় ; সেটায় বড় মান। ফলাহারে কামাই দিও না ; ফলাহার করিতে বসিয়া পাত হইতে গোটাকতক সন্দেশ চুরি করিয়া রাখিও ; বিদ্যাটি ছেলেগুলিকে শিখাইও। দেখো, চিঁড়ে দইয়ের ফলাহারে নুন মাখিতে ভুলে যেও না। কণ্ঠায় কণ্ঠায় ফলাহারের সমাপ্ত করিয়া আচমনের পর খড়িকা খাইতে খাইতে বলিও, “এত কপালে ছিল, পাষণ্ড বেটার বাড়ী আহার করিতে হইল।” এমন কথা দুটা একটা না বলিলে পাছে লোকে বলে তুমি পেটের দায়ে ফলাহার করিতে গিয়াছিলে।

-‘বঙ্কিম-জীবনী’, ৩য় সং, পৃ. ৩৬৫-৬৮।

নিশীথ রাক্ষসীর কাহিনীঅসম্পূর্ণ রচনা

প্রথম পরিচ্ছেদ

“ভাল, সারি, সত্য বল দেখি, তোমার বিশ্বাস কি? ভূত আছে?”

বরদা, ছোট ভাই সারদাকে এই কথা জিজ্ঞাসা করিল। সন্ধ্যার পর, টেবিলে দুই ভাই খাইতেছিল-একটু রোষ্ট মটন প্লেটে করিয়া, ছুরি কাঁটা দিয়া তৎসহিত খেলা করিতে করিতে জ্যেষ্ঠ বরদা এই কথা কনিষ্ঠকে জিজ্ঞাসা করিল।

সারদা প্রথমে উত্তর না করিয়া এক টুকরো রোষ্টে উত্তম করিয়া মাষ্টার্ড মাখাইয়া, বদনমধ্যে প্রেরণপূর্ব্বক, আধখানা আলুকে তৎসহবাসে প্রেরণ করিয়া, একটি রুটি ভাঙ্গিয়া বাম হস্তে রক্ষাপূর্ব্বক, অগ্রজের মুখ পানে চাহিতে চাহিতে চর্ব্বর্ণ কার্য্য সমাপন করিল। পরে, এতটুকু সেরি দিয়া, গলাটা ভিজাইয়া লইয়া বলিল, “ভূত? না।”

এই বলিয়া সারদাকৃষ্ণ সেন পরলোকগত এবং সুসিদ্ধ মেষশাবকের অবশিষ্টাংশকে আক্রমণ করিবার উদ্যোগ করিলেন।

বরদাকৃষ্ণ কিঞ্চিৎ অপ্রসন্ন হইয়া বলিল, “Rather laconic.”

সারদাকৃষ্ণের রসনার সহিত রসাল মেষমাংসের পুনরালাপ হইতেছিল, অতএব সহসা উত্তর করিল না। যথাবিহিত সময়ে অবসর প্রাপণান্তর তিনি বলিলেন, “Laconic? বরং একটা কথা বেশী বলিয়াছি। তুমি জিজ্ঞাসা করিলে ‘ভূত আছে’-আমার বলিলেই হইত ‘না।’ আমি বলিয়াছি, ‘ভূত? না।’ ‘ভূত?’ কথাটা বেশী বলিয়াছি। কেবল তোমার খাতিরে।”

“অতএব তোমার ভ্রাতৃভক্তির পুরস্কারস্বরূপ, এই স্বর্গপ্রাপ্ত চতুষ্পদের খণ্ডান্তর প্রসাদ দেওয়া গেল।” এই বলিয়া বরদা, আর কিছু মটন কাটিয়া ভ্রাতার প্লেটে ফেলিয়া দিলেন। সারদা অবিচলিতচিত্তে, তৎপ্রতি মনোভিনিবেশ করিল!

তখন বরদা বলিল, Seriously সারি, ভূত আছে বিশ্বাস কর না?”

সারি। না।

বরদা। কেন বিশ্বাস কর না?

সারদা। সেই প্রাচীন ঋষির কথা-প্রমাণাভাবাৎ। কপিল প্রমাণ-অভাবে ঈশ্বর মানিলেন না-আর আমি প্রমাণ-অভাবে ভূত মানিব?

এই বলিয়া সারদা এক গেলাস সেরি মেষের সৎকারার্থ আপনার উদরমধ্যে প্রেরণ করিল।

বরদাকৃষ্ণ চটিয়া উঠিল-বলিল, “কোথাকার বাঁদর। ভূত নাই!- ঈশ্বর নাই! তবে তুমিও নেই, আমিও নেই?”

সারি। তাই বটে। তোমার মটন রোষ্ট ফুরাইল, দেখিয়া, আমি নেই। আর আমার আহারের ঘটা দেখিয়া, বোধ হয় তুমিও নেই।

বরদা, “কই, খেলি কই?” এই বলিয়া অবশিষ্ট মাংসটুকু কাটিয়া ভাইয়ের প্লেটে সংস্থাপিত করিয়া, গ্লাসে সেরি ঢালিয়া দিলেন। সারদা যতক্ষণ মাংসের ছেদন, বিন্ধন, মুখে উত্তোলন এবং চর্ব্বণ ইত্যাদি কার্য্যে নিযুক্ত ততক্ষণ বরদা চুপ করিয়া রহিল, পরে অবসর পাইলে, সারদা জ্যেষ্ঠকে বলিল, “তুমি নাই, আর আমি নাই-ইহা প্রায় philosophically true -কেন না, আমরা “mere permanent possibilities of sensation.” আর এই যে আহার করিলাম, ইহাও না করার মধ্যে জানিবে,-কেবল সেই possible sensation গুলার মধ্যে কতকগুলা sensation হইল মাত্র।

বরদা। সেই কথাই জিজ্ঞাসা করিতেছি, ভূত দেখা, ভূতের শব্দ শুনা, এ সব possible sensation নহে?

সারদা। ভূত থাকিলে possible.

বর। ভূত নাই?

সার। তা ঠিক বলিতেছি না-তবে প্রমাণ নাই বলিয়া ভূতে বিশ্বাস নাই, ইহাই বলিয়াছি।

বর। প্রত্যক্ষ কি প্রমাণ নহে?

সার। আমি কখন ভূত প্রত্যক্ষ করি নাই।

বর। টেমস্ নদী প্রত্যক্ষ করিয়াছ?

সার। না।

বর। টেমস্ নদী আছে মান?

সার। যাহাদের কথায় বিশ্বাস করা যায়, এমন লোক প্রত্যক্ষ করিয়াছে।

বর। ভূতও এমন লোক প্রত্যক্ষ করিয়াছে।

সার। বিশ্বাসযোগ্য এমন কে? এক জনের নাম কর দেখি?

বর। মনে কর, আমি।

এই কথা বলিতে বরদার মুখ কালো হইয়া গেল-শরীর রোমাঞ্চিত হইল।

সার। তুমি?

বর। তা হইলে বিশ্বাস কর।

সার। তুমি একটু imaginative, একটু sentimental-রজ্জুকে সর্প ভ্রম হইতে পারে।

বর। তুমি দেখিবে?

সার। দেখিব না কেন?

বর। আচ্ছা তবে আহার সমাপ্ত করা যাউক।

-‘নারায়ণ’, বৈশাখ ১৩২২, পরিশিষ্ট।

বর্ষাঋতুঅগ্রন্থিত বাল্যরচনা

স্বনাথ শশধর বিরহিণী বিঘোর তমসাম্বরাবৃতা গভীরা নিশীথিনী সঙ্কাশ নিবিড় জলধারমাল গগনমণ্ডলে নিয়ত নিরীক্ষণ করিতেছি। মন্মথোন্মথিত জনরাজী হৃদয় বিদারক ঘোরঘন নির্ঘোষ নিনাদ শ্রবণে চমকিতচিত্ত চাপল্য প্রাপ্ত হইতেছে। নিবিড় নীলঙ্গিনি যমুনাপুলিনে শ্রীরাধা চাতকী নীরদ কদম্ববিহারি শ্যাম শরীরোপরি তরলিত বিকচ বিমল বনমালা তুলিয়া নীলজলধরোপরি শম্পা কম্পায়মানা হইতেছে, কর্ণকুহর-বিদারক ভীষয়াশনি নিনাদে ভুবন চমকিত হইতেছে কাদম্বনী বর্ষিত বারি বিন্দু বিশালবেগে ধরাতলে জতিত হইতেছে। চিরাশাবলম্বিনী চাতকী ধরাধর বর্ষিত জলকণা পানে প্রাণ প্রাপ্ত হইতেছে, বিঘার সজল জলদাবলী সন্দর্শনে শিখাবল শত শত নীল নিশাকর বিরাজিত পুচ্ছবিস্তারিত পুরঃসর নৃত্য করিতেছে, নিদারুণ প্রখর কর ধর বিভাকর বিশালজীমূত জালাচ্ছন্ন রহিয়াছে, ললিত লপনা ললনা করাম্ভোজ স্বরূপা বিমলা কমলিনী ম্লানমুখে মুদিতা হইল মনোমোহিনী মহিলা মালা মুখচ্ছায়া কনক চক্রাকার চারুচন্দ্রমালা জলধর জালাচ্ছন্ন রহিয়াছে, নিশাম্বর শোভনতারকামণ্ডলী অদৃশ্য হইল।

নিদাঘীয় প্রখর প্রভাকর প্রতাপে ম্লান স্বভাবাচ্ছন্ন বিপুল লাবণ্যবতী হইল মহীরুহরাজী নবদলমালায় ঝলমলায়মান হইতেছে। বিদ্যুল্লতা তুলিতা নবীনা কুমারী মাতুরঙ্কাবলম্বন সদৃশ নব লতিকামালা মহামহীরুহরাজীকে অবলম্বন করিতেছে বৃক্ষলতা সুশোভিতা বসুন্ধরা সুন্দরী বহুল কনকালঙ্কারমণ্ডিতা চন্দ্রলপনাসঙ্কাশ প্রেক্ষণীয়া হইয়াছে, জলধর রস প্রাপনে পূর্ণ যৌবনা, বিশাল বেগবতী, ভীষণ কল্লোলোন্মত্তা, তরল তরঙ্গ রঙ্গিণী, স্রোতস্বতী, স্বনাথ সাগরে শরীর সমর্পণ করিতেছে, হে নয়ন যুগল! এতন্মনোরম পদার্থপুঞ্জে সন্দর্শন সার্থক হও।

-‘সংবাদ প্রভাকর’, ১০ই জুলাই, ১৮৫২