প্রথম সর্গ

মহারণ্যে অন্ধকার, গভীর নেশায়
নির্ম্মল আকাশ নীলে, শশী ভেসে যায়৷৷
কাননের পাতা ছাদ, নীচে শশিকরে।
পবন দোলায় তারে সুমধুর স্বরে৷৷
নীচে তার অন্ধকারে, আছে ক্ষুদ্র নদী।
অন্ধকার মহাস্তব্ধ, বহে নিরবধি৷৷
ভীম তরুশাখা যথা পড়িয়াছে জলে,
কল কল করি বারি সুরবে উছলে৷৷
আঁধারে অস্পষ্ট দেখি, যেন বা স্বপন!
কলিকাস্তবকময় ক্ষুদ্র তরুগণ৷৷
শাখার বিচ্ছেদে, কভু, শশধরকর,
স্থানে স্থানে পড়িয়াছে, নীল জলোপর৷৷
ঘোর স্তব্ধ নদীতটেঃ শুধু ক্ষণে ক্ষণে,
কোন কীট যায় আসে নাড়া দিয়ে বনে৷৷
শুধু অন্ধকার মাঝে, অলক্ষ্য শরীর!
কোন হিংস্র পশু ছাড়ে, নিশ্বাস গভীর৷৷
অসংখ্য পত্রের শুধু, ভীষণ মর্ম্মর।
আর শুধু শুনি এক, সঙ্গীতের স্বর৷৷
গভীর সঙ্গীত সেই! ভাসে নদী দিয়ে।
ভাঙ্গিল গভীর স্তব্ধ স্বরে শিহরিয়ে—
কখন কোমল স্থির করুণার স্বরে,
যেন কোন বিরহিণী কেঁদে কেঁদে মরে৷৷
শুনিয়ে তা মনে হয়, ঈষৎ আভাস,
যেন কত সুখস্বপ্ন, হয়েছে বিনাশ;
কি কারণে দুঃখোদয় কিসের স্মরণে,
কিছুই বুঝি না তবু, উচাটন মনে৷৷
ফুলিয়া উঠেছে ধ্বনি, স্থির শূন্য কেটে।
ইচ্ছা করে গগনেতে উঠে যাই ফেটে৷৷
ছেঁড়ে হৃদয়ের ডোর গভীর যাতনে।
ইচ্ছা করে গলি গিয়ে মিশি গান সনে৷৷
আর যদি সঙ্গীতের দেহ দেখা পাই!
যতনেতে আলিঙ্গিয়া, মোহে মরে যাই৷৷

নদীতীরে বৃক্ষ নাহি ছিল এক স্থানে।
দীর্ঘ তৃণে চন্দ্রকর জ্বলিছে সেখানে৷৷
ছোট গাছে তারামত ফুল্ল পুষ্পদলে।
স্থির তার প্রতিরূপ স্থির নদীজলে৷৷
সুখস্বপ্নে যেন তারা, নিদ্রাভরে হাসে।
গগন গুমুরে মরে, সুখময় বাসে৷৷
সেই স্থানে বসি এক নারী একাকিনী।
ফুলহীন বনে যেন স্থলকমলিনী৷৷
মিশেছে সে চন্দ্রিকায়; ভাবে তার চিত্ত
শুধু সে স্বপ্নের ছায়া, অসত্য অনিতা৷৷
যৌবন আশার সম ফুল্ল রূপ তার।
দেখিয়া ফিরালে আঁখি, দেখি ফিরে বার৷৷
স্থিরা ধীরা সুকোমলা বিমলা অবলা।
সবে নব পুরিতেছে যৌবনের কলা৷৷
মোহন সঙ্গীতে মন বেঁধেছে যতনে।
প্রেম যেন শুনিতেছে আশার বচনে৷৷
বদনে ললিত রেখা কত হয়ে যায়।
রক্তিম নীরদ যেন শারদ সন্ধ্যায় ||
গলিল নয়নপদ্ম; মুগ্ধ তার মন,
প্রাণ মন জ্ঞান ধন জীবন যৌবন,
সকলি করেছে যেন গীতে সমর্পণ ||
কোথা হতে আসে সেই সুমধুর গান?
কেন তাতে এত আশা? কে হরিল প্রাণ?

ললিতা তাহার নাম-রাজার নন্দিনী।
জননী না ছিল তার, বিমাতা বাঘিনী।
রাজা বড় নিষ্ঠুর সতত দেয় জ্বালা;
গোপনে কতই কাঁদে মাতৃহীনা বালা।
দুর্জ্জনের সাথে তার বিবাহ সম্বন্ধ-
শুনে কেঁদে কেঁদে তার চক্ষু যেন অন্ধ।
মন্মথ নামেতে যুবা, সুঠাম, সুন্দর,
বচনে অমিয় ক্ষরে নারীমনোহর।
মোহিল ললিতাচিত তার দরশনে।
গোপনে বিবাহ হৈল মিলিল দুজনে।
জানিল বিবাহবার্ত্তা দুরন্ত রাজন্।
কন্যারে ডাকিয়া বলে পরুষ বচন ||
এ পুরী আঁধার কেন কর কলঙ্কিনী।
শীঘ্র যাও দেশান্তরে না হতে যামিনী ||
কাল যদি দেখি তোরে, বধিব পরাণ।
ভয়ে বালা সেই দণ্ডে করিলা প্রস্থান ||
মন্মথ লইয়া তারে তুলিল নৌকায়।
ভয়ে ভীত দুই জনে নদী বেয়ে যায় ||
পথিমধ্যে দস্যুদল আসিয়া রোধিল।
ললিতারে কাড়ি লয়ে বনে প্রবেশিল ||
অলঙ্কার কেড়ে নিয়ে ছেড়ে দিল তারে।
ললিতা একাকী ফিরে নদী ধারে ধারে ||
কোথায় মন্মথ গেল, তরি কোন্ ভিতে।
রজনী গভীরা তবু ভয় নাই চিতে।
এমন সময়ে শোনে সঙ্গীতের ধ্বনি।
মন্মথ গাইছে গীত বুঝিল অমনি ||
বুঝিল সঙ্কেত করে সেই প্রিয়জন,
নদীতীরে চন্দ্রালোকে বসিল তখন।
তীরেতে লাগিল তরি অতিদ্রুত হয়ে।
দেখিতে দেখিতে দুয়ে দুয়ের হৃদয়ে ||
কতই আদর করে, পেয়ে সোহাগিনী।
কতই রোদন করে কাতরা কামিনী ||

তখন ললিতা কয়, “আর জ্বালা নাহি সয়,
পড়িয়া দস্যুর হাতে, যে দুঃখ হে পেয়েছি।
কাড়ি নিল অলঙ্কার, লাঞ্ছনা কত আমার,
তীরে তীরে কেঁদে কেঁদে এতদূর এয়েছি ||
দেখা হবে তব সাথ, হেন নাহি জানি নাথ,
দয়া করি কালী আজি রেখেছেন চরণে।”
পতি বলে “শুন প্রিয়ে, তোমা ধনে হারাইয়ে,
মরিব বলিয়ে আজি, প্রবেশিনু কাননে ||
দেখিলাম দুই ধার, মহারণ্যে অন্ধকার,
নীরবে নির্ম্মলা নদী, তার মাঝে বহিছে।
ভীষণ বিজন স্তব্ধ, নাহি জীব নাহি শব্দ,
তরুদলে ঢুলে জলে, ঘুমাইয়া রহিছে ||
যে স্থির অরণ্য নদী, যেন বা সৃজনাবধি,
কোন জীব কোন কীট, তথা নাহি নড়েছে।
প্রথমে যে ছিল যথা, এখনও রয়েছে তথা,
মৃত্যুর ভীষণ ছায়া, সর্ব্বস্থানে পড়েছে ||
ভয়েতে গগন পানে, চাহিলে ভুলিনু প্রাণে,
বিমল সুনীলকাশে, শশী হেসে যেতেছে।
ভাবিলাম প্রকৃতির, সকলি গভীর স্থির,
শুধু এ হৃদয় কেন, এত দুঃখ পেতেছে!
মরি যদি পারিতাম, গোলে জল হইতাম,
এ স্থির সলিলে মিশে, হৃদয় ঘুমাইত।
তথা রিপু চিন্তাহীন, রহিতাম চিরদিন,
ললিতার দুঃখ তবে, কিসে হৃদে আইত ||

“ভাবি এ প্রকার, ছাড়িতে হুঙ্কার,
কাঁপিল কানন স্তব্ধ।
শিহরি অন্তরে, কি জানি কি ডরে,
কাঁপে হৃদি শুনি শব্দ ||
হুতাশ নাশিতে, সঙ্কেত বাঁশীতে,
গায়িলাম দুখ যত।
বাজাইয়া তায়, মরি লো তোমায়,
সঙ্কেত করেছি কত!
একবার যাই, মুরলী বাজাই,
আপনি নয়ন ঝোরে।
গলে হৃদি দুখে, এক মাত্র সুখে;
বাঁশী কি মোহিল মোরে!
গাই পরক্ষণে, দেখি নিশাবনে,
একাকিনী রূপবতী।
হয়ে চমকিত, তীরে এই ভীত,
লইলাম শীঘ্রগতি ||
কে জানে কেমনে, আশা এলো মনে,
আমারি ললিতা হবে।
কত ভাগ্য ধনি, পাই হারা মণি,
আর ছাড়া নাহি হবে?”

ললিতা
“নারে প্রাণ নারে, আর হে তোমারে,
আঁখি ছাড়া করিব না।
রহিব দুজনে, গোপন কাননে,
দেখিবে না কোন জনা ||
কাজ নাই দেশে, তথা শুধু দ্বেষে,
হেন প্রেম নাশ করে।
গঞ্জন যন্ত্রণা, কলঙ্ক রটনা,
মিলন না হয় ডরে ||
যেখানে প্রণয়, হৃদয়ে না রয়,
যেখানে তোমা না পাই।
সে দেশ কি দেশ, সে গৃহে বিদ্বেষ,
কখন যেন না যাই ||
এখানে মন্মথ, প্রণয়ের পথ,
কলঙ্কের কাঁটা হীন।
হেরি তব মুখে, নিরমল সুখে,
স্বর্গসুখে হব লীন ||
জ্বালা পৃথিবীর, সব হবে স্থির,
শুধু সুখময় মন।
লইয়ে মন্মথ, যাহা মনোমত,
করিব সকল ক্ষণ ||”
মন্মথ
“হে বিধি হে বিধি, কর কর বিধি,
এই কপালে আমার।
বল তার চেয়ে, স্বর্গপদ পেয়ে,
কি সুখে আছে হে আর ||
বিচ্ছেদ যাতনা, দিব না দিব না,
এ জনমে প্রেয়সীরে।
কাল পূর্ণ হলে, সুখে তব কোলে,
মরে যাব ধীরে ধীরে ||”