আনন্দমঠআনন্দমঠ

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চৌদ্দটি উপন্যাসের মধ্যে বারোতম ‘আনন্দমঠ’ কাহিনীপ্রধান উপন্যাসগুলার মধ্যে নাই, এখানে কাহিনী খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু হিসেবে আনেন নি লেখক। যা এসেছে, মোটা দাগে দুটিকে প্রধান করা যায়— দর্শন-রাষ্ট্রভাবনা, এবং বর্ণনা ভাষা প্রসঙ্গ।
বঙ্কিমের প্রথমদিকের উপন্যাস ধরে বুঝতে গেলে দুর্গেশনন্দিনী কিংবা কপালকুণ্ডলা-র কথা বলা ভালো। উক্ত পর্বের উপন্যাসসমূহের প্রধান প্রবণতা নর-নারীকেন্দ্রিক, তাদের ভালোবাসা, সেইসময় উদ্ভুত কিছু সঙ্কট এবং অপরাপর তাদের জীবনকে কেন্দ্র করে, সেই জায়গা থেকে আনন্দমঠ খুব শক্তিশালী না, এখানে কিছু বীররস উপস্থাপিত বটে, বেশ কিছু অংশে এডভেঞ্চারাস যুদ্ধের বর্ণনাও আছে, তবুও গল্পবিন্যাস খুব সীমিত। কিন্তু দর্শনগত অবস্থান, প্রকৃতিব্যাখ্যা এবং ভাষার গাঁথুনিতে উপন্যাসটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
লক্ষণীয় যে, ব্রিটিশসাম্রাজ্যের সময়ে, সেই উপনিবেশবাদী গঠনতন্ত্র যে মধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালি শ্রেনী নির্মাণ করেছিল, বঙ্কিম সেখান থেকে উদ্ভুত প্রথম মনস্বী-লেখক রাষ্ট্রবেত্তা, তিনিই প্রথম একটি রাষ্ট্রপ্রকল্প তার গদ্যে প্রবেশ করাতে সমর্থ ছিলেন। কী তার সেই রাষ্ট্রচিন্তা?
একবাক্যে বলতে গেলে মুসলিম-বিরোধী (বিদ্বেষী?) হিন্দু জাতীয়তাবাদ। ব্রিটিশরাজের সাথে তার কোন বিরোধের জায়গা নেই। এই একপেশে সাম্প্রদায়িক ভঙ্গিটি বঙ্কিমকে একজন লেখকের বাইরে একজন হিন্দু হিসেবে হাইলাইটেড করে ফেলে অনেক বেশি। তার ভঙ্গিটি যুদ্ধংদেহী, তিনি বর্ণনা করে যাচ্ছেন একেরপর এক মুসলিমগ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার কথা, মুসলমান একেবারে সাধারণ জনগণের সম্পদ লুঠে নিয়ে তাকে মাতৃ (পড়ুন, দেশ) স্বার্থে ব্যবহারের কথা। জাতীয়তাবাদে, বঙ্কিম ভার্ষণে, তাই দেশের চেয়ে, জণগণের চেয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ম এগিয়ে থাকে। দেশকে একটি পৌত্তলিক অবস্থান থেকে বিবেচনা করা হয় এবং সনাতন ধর্মের ধ্বজা উঁচু অবস্থানে তুলে ধরছেন বঙ্কিম। এখানে মৌলবাদী বঙ্কিমকে আজকের বিজেপি, শিবসেনার থেকে পৃথক করে এবং বিশ্বের ইসলামী মৌলবাদীদের চেয়ে পৃথক মহৎ কোন অবতারে আমরা দেখতে পাই না। যেমনটি বলেছিলেন আহমদ শরীফ—

বঙ্কিমের উপন্যাসের পথে শুরু থেকে শেষাবধি মানুষ-বঙ্কিম দশা থেকে হিন্দু-বঙ্কিম দশার দিকে ক্রমাগ্রসরায়মান।

উপন্যাসের পটভূমি ‘৭৬ এর মন্বন্তর থেকে শুরু হয়েছে, সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সন্ন্যাসীদের দুর্গ আনন্দমঠ, এর আশপাশের ভাওয়াল অঞ্চল, তার বনবনানী, প্রকৃতি এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধের ঘটনা ঘুরে ফিরে এসেছে।
আনন্দমঠ উপন্যাস ভাষা নান্দনিকতায় অনন্য। সাধু-ভাষার তৎসম শব্দবহুল যে মেদুর গাম্ভীর্য, যে সম্ভ্রান্ত সৌন্দর্য এর পদে পদে, তা বঙ্কিম অমিতকুশলতায় প্রকাশ করেছেন বারেবারে। পড়তে পড়তে বিভিন্ন জায়গায় মনে হয়েছে নিপুণ কারিগরির কোন কবিতাপাঠের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, বঙ্কিমচন্দ্র স্থানে স্থানে আস্তিনের মধ্যে থেকে ম্যাজিক দেখাচ্ছেন। উপক্রমণিকাতে জঙ্গলে রাত্রির বর্ণনাভঙ্গি—

‘অতি বিস্তৃত অরণ্য। অরণ্যমধ্যে অধিকাংশ বৃক্ষই শাল, কিন্তু তদ্ভিন্ন আরও অনেকজাতীয় গাছ আছে। গাছের মাথায় মাথায় পাতায় পাতায় মিশামিশি হইয়া অনন্ত শ্রেণী চলিয়াছে। বিচ্ছেদশূন্য, ছিদ্রশূন্য, আলোকপ্রবেশের পথমাত্রশূন্য; এইরূপ পল্লবের অনন্ত সমুদ্র, ক্রোশের পর ক্রোশ, ক্রোশের পর ক্রোশ, পবনে তরঙ্গের উপরে তরঙ্গ বিক্ষিপ্ত করিয়া চলিয়াছে। নীচে ঘনান্ধকার। মধ্যাহ্নেও আলোক অস্ফূট, ভয়ানক! তাহার ভিতরে কখন মনুষ্য যায় না। পাতার অনন্ত মর্ম্মর এবং বন্য পশুপক্ষীর রব ভিন্ন অন্য শব্দ তাহার ভিতর শুনা যায় না।’

— এই প্রকাশ আমার কাছে ধ্রুপদী সঙ্গীতের অমায়িক প্রকাশ বলে বোধ হয়েছে বারবার। বঙ্কিমের রাষ্ট্রপ্রকল্পে আগ্রহ নাই, কারণ লেখক বঙ্কিম আমাদের কাছে নমস্য, যার হাতে ভাষায় প্রাণধরে বর্ণনা ম্যাজিক হয়ে ওঠে, হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতাক্রান্ত ব্রিটিশরাজের অনুরাগী বঙ্কিম নন।