Our Blog

সপ্তম পরিচ্ছেদ

কালামুখী মুরলা যা বলিল, তাই হইল। গঙ্গারাম আবার রমার কাছে গেল। তার কারণ, গঙ্গারাম না গিয়া থাকিতে পারিবে না। রমা আর ডাকে নাই, কেবল মধ্যে মধ্যে মুরলাকে গঙ্গারামের কাছে সংবাদ লইতে পাঠাইত; কিন্তু গঙ্গারাম মুরলার কাছে কোন কথাই বলিত না; বলিত, “তোমাদের বিশ্বাস করিয়া এ সকল গোপন কথা কি বলা যায়? আমি একদিন নিজে গিয়া বলিয়া আসিব |” কাজেই রমা আবার গঙ্গারামকে ডাকিয়া পাঠাইল-মুসলমান কবে আসিবে, সে বিষয় খবর না জানিলে রমার প্রাণ বাঁচে না-যদি হঠাৎ একদিন দুপুর বেলা খাওয়াদাওয়ার সময় আসিয়া পড়ে?
কাজেই গঙ্গারাম আবার আসিল। এবার গঙ্গারাম সাহস দিল না-বরং একটু ভয় দেখাইয়া গেল। যাহাতে আবার ডাক পড়ে, তার পথ করিয়া গেল। রমাকে আপনার প্রাণের কথা বলে, গঙ্গারামের সে সাহস হয় না- সরলা রমা তার মনের সে কথা অণুমাত্র বুঝিতে পারে না। তা, প্রেমসম্ভাষণের ভরসায় গঙ্গারামের যাতায়াতের চেষ্টা নয়। গঙ্গারাম জানিত, সে পথ বন্ধ। তবু শুধু দেখিয়া, কেবল কথাবার্তা কহিয়াই এত আনন্দ!
একে ভালবাসা বলে না-তাহা হইলে গঙ্গারাম কখন রমাকে ভয় দেখাইয়া, যাহাতে তাহার যন্ত্রণা বাড়ে, তাহা করিয়া যাইতে পারিত না। এ একটা সর্ব্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট চিত্তবৃত্তি-যাহার হৃদয়ে প্রবেশ করে, তার সর্র্বনাশ করিয়া ছাড়ে। এই গ্রন্থে তাহার প্রমাণ আছে।
ভয় দেখাইয়া গঙ্গারাম চলিয়া গেল। রমা তখন বাপের বাড়ী যাইতে চাহিল, কিন্তু গঙ্গারাম, আজ কালি নহে বলিয়া চলিয়া গেল। কাজেই আজ কাল বাদে রমা আবার গঙ্গারামকে ডাকাইল। আবার গঙ্গারাম আসিল। এই রকম চলিল।
একেবারে “ধরি মাছ, না ছুঁই পানি” চলে না। রমার সঙ্গে লোকালয়ে যদি গঙ্গারামের পঞ্চাশ বার সাক্ষাৎ হইত, তাহা হইলে কিছুই দোষ হইত না; কেন না, রমার মন বড় পরিষ্কার, পবিত্র। কিন্তু এমন ভয়ে ভয়ে, অতি গোপনে, রাত্রি তৃতীয় প্রহরে সাক্ষাৎটা ভাল নহে। আর কিছু হউক না হউক, একটু বেশী আদর, একটু বেশী খোলা কথা, কথাবার্তায় একটু বেশী অসাবধানতা, একটু বেশী মনের মিল হইয়া পড়ে। তাহা হইল না যে এমন নহে। রমা তাহা আগে বুঝিতে পারে নাই। কিন্তু মুরলার একটা কথা দৈবরাণীর মত তাহার কানে লাগিল। একদিন মুরলার সঙ্গে পাঁড়ে ঠাকুরের সে বিষয়ে কিছু কথা হইল। পাঁড়ে ঠাকুর বলিলেন, “তোমার ভাই হামেশা রাত‍‍কো ভিতর‍‍মে যায়া আয়া করতাহৈ কাহেকো?”
মু। তোর কিরে বিট্র‍লে? খ্যাংরার ভয় নেই?
পাঁড়ে। ভয় ত হৈ, লেকেন জানকাহভী ডর হৈ।
মু। তোর আবার আরও জান আছে না কি? আমিই ত তোর জান!
পাঁড়ে। তোম ছোড়নেসে মরেঙ্গে নেহি, লেকেন জান ছোড়‍‍নেসে সব আঁধিয়ারা লাগেগী। তোমারা ভাইকো হম ঔর ছোড়েঙ্গে নেহি।
মু। তা না ছোড়িস আমি তোকে ছোড়েঙ্গে। কেমন কি বলিস?
পাঁড়ে। দেখো, বহ আদমি তোমারা ভাই নেহি, কোই বড়ে আদমী হোগা, বস্কা হিঁয়া কিয়া কাম হাম‍ কা কুছু মালুম নেহি, মালুম হোনেভি কুছ জরুর নেহি। কিয়া জানে, বহ অন্দরকা খবরদারিকে লিয়ে আতা যাতা হৈ। তৌ ভী, যব পুষিদা হোকে আতে যাতে তব হম লোগ্র‍কো কুছ্ মিল‍ ‍না চাহিয়ে। তোমকোত কুছ মিলা হোগা-আধা হাম‍‍কো দে দেও, হম নেহি কুছ বোলেঙ্গে।
মু। সে আমায় কিছু দেয় নাই। পাইলে দিব।
পাঁড়ে। আদা করকেু লেও।
মুরলা ভাবিল, এ সৎপরামর্শ। রাণীর কাছে গহনাখানা কাপড়খানা মুরলার পাওয়া হইয়াছে, কিন্তু গঙ্গারামের কাছে কিছু হয় নাই। অতএব বুদ্ধি খাটাইয়া পাঁড়েজীকে বলিল, “আচ্ছা, এবার যেদিন আসিবে, তুমি ছাড়িও না। আমি বলিলেও ছাড়িও না। তা হলে কিছু আদায় হইবে |”
তার পর যে রাত্রিতে গঙ্গারাম পুরপ্রবেশার্থ আসিল, পাঁড়েজী ছাড়িলেন না। মুরলা অনেক বকিল ঝকিল, শেষ অনুনয় বিনয় করিল, কিছুতেই না। গঙ্গারাম পরামর্শ করিলেন, পাঁড়ের কাছে প্রকাশ হইবেন, নগররক্ষক জানিতে পারিলে, পাঁড়ে আর আপত্তি করিবে না। মুরলা বলিল, “আপত্তি করিবে না, কিন্তু লোকের কাছে গল্প করিবে। এ আমার ভাই যায় আসে, গল্প করিলে যা
দোষ, আমার ঘাড়ের উপর দিয়া যাইবে |” কথা যথার্থ বলিয়া গঙ্গারাম স্বীকার করিলেন। তার পর গঙ্গারাম মনে করিলেন, “এটাকে এইখানে মারিয়া ফেলিয়া দিয়া যাই |” কিন্তু তাতে আরও গোল। হয় ত একেবারে এ পথ বন্ধ হইয়া যাইবে। সুতরাং নিরস্ত হইলেন। পাঁড়ে কিছুতেই ছাড়িল না, সুতরাং সে রাত্রিতে ঘরে ফিরিয়া যাইতে হইল।
মুরলা একা ফিরিয়া আসিলে রাণী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তিনি কি আজ আসিবেন না?”
মু। তিনি আসিয়াছিলেন—পাহারাওয়ালা ছাড়িল না।
রাণী। রোজ ছাড়ে, আজ ছাড়িল না কেন?
মু। তার মনে একটা সন্দেহ হইয়াছে।
রাণী। কি সন্দেহ?
মু। আপনার শুনিয়া কাজ কি? সে সকল আপনার সাক্ষাতে আমরা মুখে আনিতে পারি না, তাহাকে কিছু দিয়া বশীভূত করিলে ভাল হয়।
যে অপবিত্র, সে পবিত্রকেও আপনার মত বিবেচনা করিয়া কাজ করে, বুঝিতে পারে না যে, পবিত্র মানুষ আছে, সুতরাং তাহার কার্য ধ্বংস হয়। মুরলার কথা শুনিয়া রমার গা দিয়া ঘাম বাহির হইতে লাগিল। রমা ঘামিয়া, কাঁপিয়া, বসিয়া পড়িল। বসিয়া শুইয়া পড়িল। শুইয়া চক্ষু বুজিয়া অজ্ঞান হইল। এমন কথা রমার মনে এক দিনও হয় নাই। আর কেহ হইলে মনে আসিত, কিন্তু রমা এমনই ভয়বিহ্বলা হইয়া গিয়াছিল যে, সে দিক্টা একেবারে নজর করিয়া দেখে নাই। এখন বজ্রাঘাতের মত কথাটা বুকের উপর পড়িল। দেখিল, ভিতরে যাই থাক, বাহিরে কথাটা ঠিক। মনে ভাবিয়া দেখিল, বড় অপরাধ হইয়াছে। রমার স্থূল বুদ্ধি, তবু স্ত্রীলোকের, বিশেষতঃ হিন্দুর মেয়ের একটা বুদ্ধি আছে, যাহা একবার উদয় হইলে এ সকল কথা বড় পরিষ্কার হইয়া থাকে। যত কথাবার্তা হইয়াছিল, রমা মনে করিয়া দেখিল-বুঝিল, বড় অপরাধ হইয়াছে। তখন রমা মনে ভাবিল, বিষ খাইব, কি গলায় ছুরি দিব। ভাবিয়া চিন্তিয়া স্থির করিল, গলায় ছুরি দেওয়াই উচিত, তাহা হইলে সব পাপ চুকিয়া যায়, মুসলমানের ভয়ও ঘুচিয়া যায়, কিন্তু ছেলের কি হইবে? রমা শেষ স্থির করিল, রাজা আসিলে গলায় ছুরি দেওয়া যাইবে, তিনি আসিয়া ছেলের বন্দোবস্ত যা হয় করিবেন-তত দিন মুসলমানের হাতে যদি বাঁচি। মুসলমানের হাতে ত বাঁচিব না নিশ্চিত, তবু গঙ্গারামকে আর ডাকিব না, কি লোক পাঠাইব না। তা রমা আর গঙ্গারামের কাছে লোক পাঠাইল না, কি মুরলাকে যাইতে দিল না।
মুরলা আর আসে না, রমা আর ডাকে না, গঙ্গারাম অস্থির হইল। আহার নিদ্রা বন্ধ হইল। গঙ্গারাম মুরলার সন্ধানে ফিরিতে লাগিল। কিন্তু মুরলা রাজবাটীর পরিচারিকা—রাস্তাঘাটে সচরাচর বাহির হয় না, কেবল মহিষীর হুকুমে গঙ্গারামের সন্ধানে বাহির হইয়াছিল। গঙ্গারাম মুরলার কোন সন্ধান পাইলেন না। শেষ নিজে এক দূতী খাড়া করিয়া মুরলার কাছে পাঠাইলেন-তাকে ডাকিতে। রমার কাছে পাঠাইতে সাহস হয় না।
মুরলা আসিল-জিজ্ঞাসা করিল, “ডাকিয়াছ কেন?”
গঙ্গারাম। আর খবর নাও না কেন?
মু। জিজ্ঞাসা করিলে খবর দাও কই? আমাদের ত তোমার বিশ্বাস হয় না?
গ। তা ভাল, আমি গিয়াও না হয় বলিয়া আসিতে পারি।
মু। তাতে, যে ফল নৈবিদ্যিতে দেয় তার আটটি।
গ। সে আবার কি?
মু। ছোট রাণী আরাম হইয়াছেন।
গ। কি হইয়াছিল যে আরাম হইয়াছেন?
মু। তুমি আর জান না কি হইয়াছিল?
গ। না।
মু। দেখ নাই, বাতিকের ব্যামো?
গ। সে কি?
মু। নহিলে তুমি অন্দরমহলে ঢুকিতে পাও?
গ। কেন, আমি কি?
মু। তুমি কি সেখানকার যোগ্য?
গ। আমি তবে কোথাকার যোগ্য?
মু। এই ছেঁড়া আঁচলের। বাপের বাড়ী লইয়া যাইতে হয় ত আমাকে লইয়া চল। অনেক দিন বাপ-মা দেখি নাই।
এই বলিয়া মুরলা হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল। গঙ্গারাম বুঝিলেন, এ দিকে কোন ভরসা নাই। ভরসা নাই, এ কথা কি কখন মন বুঝে? যতক্ষণ পাপ করিবার শক্তি থাকে, ততক্ষণ যার মন পাপে রত হইয়াছে, তার ভরসা থাকে। “পৃথিবীতে যত পাপ থাকে, সব আমি করিব, তবু আমি রমাকে ছাড়িব না |” এই সঙ্কল্প করিয়া কৃতঘ্ন গঙ্গারাম, ভীষণমূর্তি হইয়া আপনার গৃহে প্রত্যাগমন করিল। সেই রাত্রিতে ভাবিয়া ভাবিয়া গঙ্গারাম রমা ও সীতারামের সর্বনাশের উপায় চিন্তা করিল।

No comments:

Post a Comment

বঙ্কিম রচনাবলী Designed by Templateism | Blogger Templates Copyright © 2014

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.