Our Blog

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

সন্ধ্যার পর সেই ঘরে সাগর ও প্রফুল্ল, দুই জনে দ্বার বন্ধ করিয়া চুপি চুপি কথাবার্তা কহিতেছিল, এমন সময়ে কে আসিয়া কপাটে ঘা দিল। সাগর জিজ্ঞাসা করিল, “কে গো?”

“আমি গো।”

সাগর প্রফুল্লের গা টিপিয়া চুপি চুপি বলিল, “কথা কসনে; সেই কালপেঁচাটা এসেছে ।”

প্র। সতীন?

সা। হ্যাঁ–চুপ!

যে আসিয়াছিল, সে বলিল, “কে গা ঘরে, কথা কসনে কেন? যেন সাগর বোয়ের গলা শুনলাম না?”

সা। তুমি কে গা–যেন নাপিত বোয়ের গলা শুনলাম না?

“আঃ মরণ আর কি! আমি কি নাপিত বোয়ের মতন?”

সা। কে তবে তুমি?

“তোর সতীন! সতীন! সতীন! নাম নয়ান বৌ।”

(বউটির নাম–নয়নতারা–লোকে তাহাকে “নয়ান বৌ” বলিত–সাগরকে “সাগর বৌ” বলিত।)

সাগর তখন কৃত্রিম ব্যস্ততার সহিত বলিল, “কে! দিদি! বালাই, তুমি কেন নাপিত বৌয়ের মতন হতে যাবে? সে যে একটু ফরসা।”

ন। মরণ আর কি–আমি কি তার চেয়েও কালো? তা সতীন এমনই বটে–তবু যদি চৌদ্দ বছরের না হতিস!

সা। তা চৌদ্দ বছর হলো ত কি হলো–তুমি সতের–তোমার চেয়ে আমার রূপও আছে, যৌবনও আছে।

ন। রূপ যৌবন নিয়ে বাপের বাড়ীতে বসে বসে ধুয়ে খাস। আমার যেমন মরণ নাই, তাই তোর কাছে কথা জিজ্ঞাসা করতে এলেম।

সা। কি কথা, দিদি?

ন। তুই দোরই খুললি নে, তার কথা কব কি? সন্ধ্যে রাত্রে দোর দিয়েছিস কেন লা?

সা। আমি ভাই লুকিয়ে দুটো সন্দেশ খাচ্চি। তুমি কি খাও না?

ন। তা খা খা। (নয়ন নিজে সন্দেশ বড় ভালবাসিত) বলি, জিজ্ঞাসা করিতেছিলাম কি, আবার একজন এয়েছে না কি?

সা। আবার একজন কি? স্বামী?

ন। মরণ আর কি! তাও কি হয়?

সা। হলে ভাল হতো–দুই জনে ভাগ করিয়া নিতাম। তোমার ভাগে নূতনটা দিতাম।

ন। ছি! ছি! ও সব কথা কি মুখে আনে?

সা। মনে?
ন। তুই আমায় যা ইচ্ছা তাই বলিবি কেন?

সা। তা ভাই, কি জিজ্ঞাসা করবে, না বুঝাইয়া বলিলে কেমন করিয়া উত্তর দিই?

ন। বলি, গিন্নীর না কি আর একটি বউ এয়েছে?

সা। কে বউ?

ন। সেই মুচি বউ।

সা। মুচি? কই, শুনি নে ত।

ন। মুচি, না হয় বাগদী?

সা। তাও শুনি নে।

ন। শোন নি–আমাদের একজন বাগদী সতীন আছে।

সা। কই? না।

ন। তুই বড় দুষ্ট। সেই যে, প্রথম যে বিয়ে।

সা। সে ত বামনের মেয়ে।

ন। হ্যাঁ, বামনের মেয়ে! তা হলে আর নিয়ে ঘর করে না?

সা। কাল যদি তোমায় বিদায় দিয়ে, আমায় নিয়ে ঘর করে, তুমি কি বাগদীর মেয়ে হবে?

ন। তুই আমায় গাল দিবি কেন লা, পোড়ারমুখী?

সা। তুই আর এক জনকে গাল দিচ্ছিস কেন লা, পোড়ারমুখী?

ন। মরগে যা–আমি ঠাকুরুণকে গিয়া বলিয়া দিই, তুই বড় মানুষের মেয়ে বলে আমায় যা ইচ্ছে তাই বলিস।

এই বলিয়া নয়নতারা ওরফে কালপেঁচা ঝমর ঝমর করিয়া ফিরিয়া যায়–তখন সাগর দেখিল প্রমাদ! ডাকিল, “না দিদি, ফের ফের। ঘাট হয়েছে, দিদি ফের! এই দোর খুলিতেছি।”

নয়নতারা রাগিয়াছিল–ফিরিবার বড় মত ছিল না। কিন্তু ঘরের ভিতর দ্বার দিয়া সাগর কত সন্দেশ খাইতেছে, ইহা দেখিবার একটু ইচ্ছা ছিল, তাই ফিরিল। ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া দেখিল–সন্দেশ নহে–আর একজন লোক আছে। জিজ্ঞাসা করিল, “এ আবার কে?”

সা। প্রফুল্ল।

ন। সে আবার কে?

সা। মুচি বৌ।

ন। এই সুন্দর?

সা। তোমার চেয়ে নয়।

ন। নে, আর জ্বালাস নে। তোর চেয়ে ত নয়।

No comments:

Post a Comment

বঙ্কিম রচনাবলী Designed by Templateism | Blogger Templates Copyright © 2014

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.