Our Blog

বিংশ পরিচ্ছেদ

জয়ন্তী প্রসন্নমনে মহম্মদপুর হইতে নির্গত হইল।দুঃখ কিছুই নাই-মনে বড় সুখ। পথে চলিতে চলিতে মনে মনে ডাকিতে লাগিল— “জয় জগন্নাথ! তোমার দয়া অনন্ত। তোমার মহিমার পার নাই! তোমাকে যে না জানে, যে না ভাবে, সেই ভাবে বিপদ! বিপদ কাহাকে বলে প্রভু? তাহা বলিতে পারি না; তুমি যাহাতে আমাকে ফেলিয়াছিলে, তাহা পরম সম্পদ! আমি এত দিন এমন করিয়া বুঝিতে পারি নাই যে, আমি ধর্মভ্রষ্টা; কেন না, আমি বৃথা গর্বে গর্বিতা, বৃথা অভিমানে অভিমানিনী, অহঙ্কারবিমূঢ়া। অর্জ্জুন ডাকিয়াছিলেন, আমিও ডাকিতেছি প্রভু, শিখাও প্রভু! শাসন কর!

যচ্ছ্রেয় স্যান্নিশ্চিতং ব্রূহি তন্মে
শিষ্যস্তেহং সাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম্ |”

জয়ন্তী, জগদীশ্বরকে সম্মুখ রাখিয়া, তাঁর সঙ্গে কথোকথন করিতে শিখিয়াছিল। মনের সকল কথা খুলিয়া বিশ্বপতির নিকট বলিতে শিখিয়াছিল। বালিকা যেমন মা—বাপের নিকট আবদার করে, জয়ন্তীও তেমনই সেই পরম পিতামাতার নিকট আবদার করিতে শিখিয়াছিল। এখন জয়ন্তী একটা আবদার লইল। আবদার, সীতারামের জন্য। সীতারামের যে মতি গতি, সীতারাম ত উৎসন্ন যায়, বিলম্ব নাই। তার কি রক্ষা নাই? অনন্ত দয়ার আধারে তাহার জন্য কি একটু দয়া নাই? জয়ন্তী তাই ভাবিতেছিল। ভাবিতেছিল, “আমি জানি, ডাকিলে তিনি অবশ্য শুনেন। সীতারাম ডাকে না-ডাকিতে ভুলিয়া গিয়াছে—নহিলে এমন করিয়া ডুবিবে কেন? জানি, পাপীর দণ্ডই এই যে, সে দয়াময়কে ডাকিতে ভুলিয়া যায়। তাই সীতারাম তাঁকে ডাকিতে ভুলিয়া গিয়াছে, আর ডাকে না। তা, সে না ডাকুক, আমি তার হইয়া জগদীশ্বরকে ডাকিলে তিনি কি শুনিবেন না? আমি যদি বাপের কাছে আবদার করি যে, এই পাপিষ্ঠ সীতারামকে পাপ হইতে মোচন কর, তবে কি তিনি শুনিবেন না? জয় জগন্নাথ! তোমার নামের জয়! সীতারামকে উদ্ধার করিতে হইবে |”
তার পর জয়ন্তী ভাবিল যে, “যে নিশ্চেষ্ট তাহার ডাক ভগবান শুনেন না। আমি যদি নিজে সীতারামের উদ্ধারের জন্য কোন চেষ্টা না করি, তবে ভগবান কেন আমার কথায় কর্ণপাত করিবেন? দেখি, কি করা যায়। আগে শ্রীকে চাই। শ্রী পলাইয়া ভাল করে নাই। অথবা না পলাইলেও কি হইত বলা যায় না। আমার কি সাধ্য যে, ভগবন্নির্দিষ্ট কার্যকারণপরম্পরা বুঝিয়া উঠি |”
জয়ন্তী তখন শ্রীর কাছে চলিল। যথাকালে শ্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হইল। জয়ন্তী শ্রীর কাছে সমস্ত বৃত্তান্ত সবিশেষ বলিল। শ্রী বিষণ্ণ হইয়া বলিল, “রাজার অধঃপতন নিকট। তাঁহার উদ্ধারের কি কোন উপায় নাই?”
জ। উপায় ভগবান। ভগবান‍‍কে তিনি ভুলিয়া গিয়াছেন। ভগবান‍কে যে দিন আবার তাঁর মনে হইবে, সেই দিন তাঁহার আবার উন্নতি আরম্ভ হইবে।
শ্রী। তাহার উপায় কি? আমি যখন তাঁহার কাছে ছিলাম, তখন সর্বদা ভগবৎপ্রসঙ্গই তাঁর কাছে কহিতাম। তিনি মনোযোগ দিয়া শুনিতেন।
জ। তোমার মুখের কথা, তাই মনোযোগ দিতেন। তোমার মুখপানে হাঁ করিয়া চাহিয়া থাকিতেন, তোমার রূপে ও কণ্ঠে মুগ্ধ হইয়া থাকিতেন, ভগবৎপ্রসঙ্গ তাঁর কানে প্রবেশ করিত না। তিনি কোন দিন তোমার এ সকল কথার কিছু উত্তর করিয়াছিলেন কি? কোন দিন কোন তত্ত্বের মীমাংসা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন কি? হরিনামে কোন দিন উৎসাহ দেখিয়াছিলে কি?
শ্রী। না। তা বড় লক্ষ্য করি নাই।
জ। তবে সে মনোযোগ তোমার লাবণ্যের প্রতি,–ভগবৎপ্রসঙ্গে নয়।
শ্রী। তবে, এখন কি কর্তব্য?
জ। তুমি করিবে কি? তুমি ত বলিয়াছ যে, তুমি সন্ন্যাসিনী, তোমার কর্ম নাই?
শ্রী। যেমন শিখাইয়াছ।
জ। আমি কি তাই শিখাইয়াছিলাম? আমি যে শিখাই নাই যে, অনুষ্ঠেয় যে কর্ম, অনাসক্ত হইয়া ফলত্যাগপূর্বক তাহার নিয়ত অনুষ্ঠান করিলেই কর্মত্যাগ হইল, নচেৎ হইল না?14 স্বামিসেবা কি তোমার অনুষ্ঠেয় কর্ম নহে?
শ্রী। তবে আমাকে পলাইতে পরামর্শ দিয়াছিলে কেন?
জ। তুমি যে বলিলে, তোমার শত্রু, রাজা নিয়া বার জন। যদি ইন্দ্রিয়গণ তোমার বশ্য নয়, তবে তোমার স্বামিসেবা সকাম হইয়া পড়িবে। অনাসক্তি ভিন্ন কর্মানুষ্ঠানে কর্মত্যাগ ঘটে না। তাই তোমাকে পলাইতে বলিয়াছিলাম। যার যে ভার সয় না, তাকে সে ভার দিই না। “পদং সহেত ভ্রমরস্য পেলবং” ইত্যাদি উপমা মনে আছে ত?
শ্রী বড় লজ্জিতা হইল। ভাবিয়া বলিল, “কাল উহার উত্তর দিব |”
সে দিন আর সে কথা হইল না। শ্রী সে দিন জয়ন্তীর সঙ্গে বড় দেখা-সাক্ষাৎ করিল না। পরে জয়ন্তী তাহাকে ধরিল। বলিল, “আমার কথার কি উত্তর সন্ন্যাসিনী?”
শ্রী বলিল, “আমায় আর একবার পরীক্ষা কর |”
জয়ন্তী বলিল, “এ কথা ভাল। তবে মহম্মদপুর চল। তোমার আমার অনুষ্ঠেয় কর্ম কি, পথে তাহার পরামর্শ করিতে করিতে যাইব |”
দুই জনে তখন পুনর্বার মহম্মদপুর অভিমুখে যাত্রা করিল।

======================
14- কার্য্যমিত্যেব যৎ নিয়তং ক্রিয়তেঅর্জ্জুন।
সঙ্গং ত্যক্তা ফলঞ্চৈব স ত্যাগঃ সাত্ত্বিকো মতঃ || -গীতা, ১৮।৯
======================

No comments:

Post a Comment

বঙ্কিম রচনাবলী Designed by Templateism | Blogger Templates Copyright © 2014

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.